ফরিদপুরের ভাঙ্গায় একটি বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কেন্দ্রটি সিলগালা করেছে প্রশাসন। নিহতের পরিবারের অভিযোগ ও অন্য রোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র।
ঘটনার বিবরণ
শুক্রবার সকালে ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়ক সংলগ্ন ভাঙ্গা পৌরসভার নওপাড়া গ্রামে অবস্থিত ‘আলোর দিশা’ নামের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রের ভেতরে রাজ্জাক মাতুব্বর নামের এক যুবককে মারধরের ফলে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই কেন্দ্রের মালিক মিজানুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা পালিয়ে যান।

নিহতের পরিচয়
নিহত রাজ্জাক মাতুব্বরের বয়স চল্লিশ বছর। তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব হাসামদিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং ছামাদ মাতুব্বরের ছেলে।
কেন্দ্রে উত্তেজনা ও ভাঙচুর
ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রের ভেতরে আটকে থাকা প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন রোগী বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এ সময় তারা জানালা, দরজা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন এবং চিৎকার শুরু করেন। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
উদ্ধার অভিযান ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
সংবাদ পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রোগীদের স্বজনদের যৌথ হস্তক্ষেপে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে চিৎকার ও উত্তেজনার কারণে আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড় জমে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশজন রোগীকে কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করা হয়।
রোগীদের স্থানান্তর
উদ্ধার হওয়া রোগীদের মধ্যে ত্রিশজনকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি রোগীদের ফরিদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে অন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন।
পরিবারের অভিযোগ
নিহত রাজ্জাক মাতুব্বরের ভাই জানান, কয়েক দিন আগে তার ভাইকে ওই নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। শুক্রবার সকালে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয় রাজ্জাক অসুস্থ। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি ভাইয়ের মরদেহ দেখতে পান। তার দাবি, মরদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রের মালিক ও কর্মীরাই মারধর করে রাজ্জাককে হত্যা করেছে এবং এর সুষ্ঠু বিচার চান।
অন্যান্য রোগীদের বক্তব্য
নিরাময় কেন্দ্রে থাকা অন্যান্য রোগীরাও অভিযোগ করেছেন, সেখানে নিয়মিত খাবারের পরিবর্তে মারধর ও নির্যাতন করা হতো। প্রতিবাদ করলে খাবার বন্ধ করে দেওয়া হতো। রোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে আনা খাবারও অনেক সময় কর্মীরা নিজেরা খেয়ে নিত বলে অভিযোগ ওঠে। তাদের দাবি, রাজ্জাককে আগের রাতে মারধর করা হয়েছিল এবং এর ফলেই তার মৃত্যু হয়েছে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা
ফরিদপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, ঘটনার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে নিরাময় কেন্দ্রটি সিলগালা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোগীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। প্রাথমিকভাবে শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং নাক-কান দিয়ে রক্তক্ষরণের আলামত পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















