দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে দুর্বল করার চেষ্টা করে আসছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই জোটকে তিনি রাশিয়ার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ দেখানোয় ন্যাটোর ভেতরে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যেই সন্তোষ প্রকাশ করছে মস্কো।
গ্রিনল্যান্ড ঘিরে উত্তেজনা
ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে ডেনিশ বাহিনী। ঠিক এমন সময় ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক দিনে ইউরোপের আটটি দেশ সেখানে সীমিত সংখ্যক সেনা পাঠালে ট্রাম্প তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিও দেন। এর ফলে ন্যাটোর ভেতরেই এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে।

ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে বিশ্ব ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড যুক্ত করার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারলে ট্রাম্প শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, ন্যাটো এখন গভীর সংকটে রয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, জোটের এক সদস্য আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে—এমন পরিস্থিতি তিনি কল্পনাও করেননি। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাশিয়া শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো পরিকল্পনা মস্কোর নেই।

ক্রিমিয়ার সঙ্গে তুলনা
লাভরভ ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড আগ্রহের সঙ্গে রাশিয়ার ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের তুলনা টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ড যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাশিয়ার কাছে ক্রিমিয়া ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্তব্য ইউরোপের অনেক নেতার আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। তাঁদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ইউক্রেন ও পূর্ব ইউরোপে পুতিনকে আরও আগ্রাসী হতে উৎসাহ দিতে পারে।
ন্যাটোর জন্য বিপজ্জনক সময়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই বিরোধ ন্যাটোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত। সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জন ফোরম্যানের মতে, এটি এমন এক জরুরি সংকট যা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপকে বিভক্ত করে দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া নিশ্চয়ই মনে করছে তাদের জন্য সুখবর একের পর এক আসছে।
আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার হিসাব
যদিও রাশিয়া ন্যাটোর সংকটে খুশি, তবু তারা এটাও জানে যে ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেন, তাহলে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়বে। এই অঞ্চলে রাশিয়া ইতোমধ্যে সোভিয়েত যুগের ঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফভাঙা জাহাজের বহর গড়ে তুলেছে। তবুও স্বল্পমেয়াদে গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক ন্যাটোর ভেতর অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, যা মস্কোর জন্য সুবিধাজনক।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও ন্যাটো বিস্তার
ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই পুতিনের প্রধান অভিযোগ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশ ন্যাটোতে যোগ দেয়, যাদের মধ্যে এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড এখন জোটের সবচেয়ে দৃঢ় সদস্য। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল কিয়েভকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়া থেকে ঠেকানো। ইউরোপীয় নেতাদের অভিযোগ, এরপর থেকেই রাশিয়া ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে—ড্রোন অনুপ্রবেশ, সমুদ্রের নিচের কেবল কাটা ইত্যাদির মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের স্বপ্ন
ক্রেমলিনঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক সের্গেই মার্কভ মনে করছেন, ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষেই যাবে। তাঁর মতে, ন্যাটো ভেঙে পড়লে ইউক্রেন ইউরোপের সমর্থন হারাবে এবং রাশিয়ার প্রভাবের মধ্যে চলে আসবে। তবে পশ্চিমা নেতারা এই ধরনের পূর্বাভাসকে অবাস্তব মনে করছেন।
পশ্চিমাদের পাল্টা চেষ্টা
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নেতা এখন ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে গ্রিনল্যান্ড দখলের উদ্যোগ অপ্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে তারা বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো এবং ন্যাটোর ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তৈরি হওয়া বিভাজন ন্যাটোর ইতিহাসে এক গভীর অনিশ্চয়তার সময় তৈরি করেছে, যার সুযোগ নিতে মরিয়া রাশিয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















