চীনা আইসক্রিম ও মিল্ক টি ব্র্যান্ড মিক্সিউ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা শুরু করতেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র এক ডলারের কাছাকাছি দামে সফট সার্ভ আইসক্রিম আর তুলনামূলকভাবে সস্তা মিল্ক টি অনেকের কৌতূহল বাড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া আর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় থাকা তরুণ প্রজন্মের কাছে এই কমদামি ব্র্যান্ড যেন সময়োপযোগী সমাধান হিসেবেই হাজির হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার উচ্চ মজুরি, ব্যয়বহুল ভাড়া আর শুল্ক ব্যবস্থার মধ্যে মিক্সিউ কি তার অতি কম মুনাফার মডেল ধরে রাখতে পারবে।
চীনে গড়ে ওঠা সাফল্যের ভিত্তি
মিক্সিউ ইতিমধ্যেই দোকান সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্রুত খাদ্য শৃঙ্খল। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চীনের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই একটি ব্যবসায়িক কাঠামো। প্রতিষ্ঠানটি নিজেই প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কাঁচামাল উৎপাদন করে, ফলে খরচ কমে আসে এবং সব শাখায় একই মান বজায় রাখা সম্ভব হয়। দুধের গুঁড়া কিংবা লেবুর মতো উপকরণ বাজারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা পড়ে। এর সঙ্গে রয়েছে স্বল্প ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি, যা আরও বেশি উদ্যোক্তাকে যুক্ত করে এবং বিক্রির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির আয়ও বাড়ায়।
ভৌগোলিক সুবিধা ও কম খরচের বাস্তবতা
মিক্সিউয়ের দ্রুত বিস্তার হয়েছে মূলত চীনের ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে শ্রম ও ভাড়ার খরচ কম এবং প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা সীমিত। এই পরিবেশেই স্বাভাবিকভাবে কম দামের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশেও একই বাস্তবতা থাকায় সেখানে মডেলটি সহজে মানিয়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন।
আমেরিকার বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ
লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কে দোকান খোলা ব্র্যান্ডের জন্য দৃশ্যমানতা বাড়ালেও একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে। এখানে শ্রম ব্যয় অনেক বেশি, বাণিজ্যিক ভাড়া বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে, তার ওপর রয়েছে শুল্ক, পরিবহন খরচ ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন। এই পরিস্থিতিতে অতি কম দামে পণ্য বিক্রি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন। আবার দাম বাড়ালে মিক্সিউ এমন এক মাঝামাঝি বাজারে ঢুকে পড়তে পারে, যেখানে শুধু কম দাম আর যথেষ্ট পার্থক্য গড়ে তোলে না।

সংস্কৃতি ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের প্রশ্ন
চীনে মিক্সিউ কেবল পানীয় বিক্রেতা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক উপস্থিতি। তুষার রাজা নামের মাসকট, গান, মিম আর পণ্যের মাধ্যমে ব্র্যান্ডটি বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নেই। প্রাথমিকভাবে দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যাচ্ছে মূলত এশীয় ভোক্তাদের মধ্যে, যা কৌতূহলনির্ভর আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। সময়ের সঙ্গে মিক্সিউকে ঠিক করতে হবে, তারা কতটা স্থানীয় রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেবে আর কতটা নিজেদের পরিচয় ধরে রাখবে।
বড় ছবির ইঙ্গিত
মিক্সিউ আর লাকিন কফির মতো ব্র্যান্ডগুলোকে প্রায়ই চীনের ভোক্তা উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে তারা দক্ষতা, স্বয়ংক্রিয়তা আর পরিসরের ওপর নির্ভরশীল একটি নির্দিষ্ট ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। একই সময়ে চীনে নকশা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক নতুন ক্যাফে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে পশ্চিমা বাজারে আরও ভিন্নধর্মী প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। তাই মিক্সিউয়ের আমেরিকায় যাত্রা হয়তো শুধু একটি ব্র্যান্ডের সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং চীনা ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোর বৈশ্বিক অভিযাত্রার একটি পূর্বাভাস।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















