২০২৬ সালে পা রাখতে গিয়ে পাকিস্তান এক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। বিদেশি ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পারলেও দেশটির সামনে জমে থাকা সংকটগুলো এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পারমাণবিক শক্তিধর একমাত্র মুসলিম দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিপরীতে, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও কাঠামোগত সমস্যাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ঋণসংকট এড়ালেও স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাত বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর, পাকিস্তানকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থা কিছুটা ফিরেছে যে দেশটি আপাতত টিকে থাকতে পারবে। তবে এই স্বস্তির আড়ালে জমে থাকা ঝুঁকিগুলো দ্রুত বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপ
২০২৫ সালে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পাকিস্তানের জলবায়ু ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৃষ্টিপাত আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলো বহুপাক্ষিক সহযোগিতা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রবাহ কমে গেছে। পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে তাই সংকট মোকাবিলায় ক্রমেই নিজেদের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর ও বেদনাদায়ক অভ্যন্তরীণ সংস্কারে যেতে হবে।
ধীরগতির অর্থনীতি ও জনসংখ্যার চাপ
বর্তমানে পাকিস্তানের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় তিন শতাংশ, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সামান্য ওপরে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের ঘাটতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলেছে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক বিভাজন ও বিনিয়োগ সংকট
গত তিন বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কাঠামোর মধ্যে টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সমর্থন নিয়ে সরকার টিকে থাকলেও রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা কম। এর ফলে পাকিস্তান কম প্রবৃদ্ধির এক চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: জাতীয় ঐক্যের অভাব ও নিরাপত্তা সংকট
বহুজাতিক ও বহুভাষিক পাকিস্তানে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সবসময়ই কঠিন। বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা চলছে। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ইমরান খানের সমর্থকদের শাসন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।
এই দুই প্রদেশই আফগানিস্তানের সীমান্তঘেঁষা, যা সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বারবার জঙ্গি হামলার ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মোকাবিলায় শক্তিশালী জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: সামাজিক সংকট ও কাঠামোগত সংস্কার
পাকিস্তানের প্রায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি চরম দারিদ্র্যে বসবাস করে। প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর, যেখানে নারীদের মধ্যে নিরক্ষরতার হার আরও বেশি। পাঁচ বছরের নিচে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভুগছে।
এই চিত্র অর্থনীতির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও সম্পদের অসম বণ্টনের ফল। শাসকগোষ্ঠীর জন্য এসব সমস্যা সমাধানে বিলম্বিত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া জরুরি। তা না হলে দারিদ্র্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।
প্রদর্শনমূলক সাফল্য বনাম বাস্তব অগ্রাধিকার
গত এক বছরে পাকিস্তানের শাসকরা বিদেশ সফর ও আন্তর্জাতিক অতিথি গ্রহণে ব্যস্ত ছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সীমান্ত সংঘর্ষকে ইসলামাবাদ সামরিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে এসব ঘটনা দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ বদলাতে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না।
পাকিস্তানের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করা। রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক বিনিয়োগ ছাড়া ২০২৬ এবং তার পরের বছরগুলোতে স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















