ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম নয়া দিল্লিতে প্রকাশ্য কোনও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ‘সেভ ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
শেখ হাসিনা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও সহিংস আখ্যা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখন সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনে নিমজ্জিত। তার অভিযোগ, বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত একটি পুতুল সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও বক্তব্যের প্রেক্ষাপট
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক মন্ত্রী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা নিজে মঞ্চে উপস্থিত না থাকলেও ভরা মিলনায়তনে তার অডিও বার্তা সম্প্রচার করা হয়। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ গভীর এক সংকটের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার উল্লেখ করে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে দেশের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন।
ক্ষমতাচ্যুতির অভিযোগ ও বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা
শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়। তার ভাষায়, ওই ঘটনার পর থেকেই দেশ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে, মানবাধিকার ভেঙে পড়েছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দলবদ্ধ সহিংসতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির কোনও নিরাপত্তা নেই।
ইউনূসের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান
বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা। একই সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, শহীদদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনরুদ্ধার করাই এখন প্রধান দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য
শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ দেশের সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তার দাবি, জনগণের সমর্থন নিয়ে দলটি আবার দেশের হারানো সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবে।
দেশের আরোগ্য নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা দাবি
বক্তব্যে শেখ হাসিনা দেশের সংকট কাটাতে পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন। প্রথমত, ইউনূস নেতৃত্বাধীন অবৈধ প্রশাসন অপসারণ, কারণ এই সরকার বহাল থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিনের সহিংসতা ও নৈরাজ্য বন্ধ করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার অটল নিশ্চয়তা। চতুর্থত, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা এবং বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পঞ্চম ও শেষ দাবিতে তিনি গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নতুন ও সত্যিকারের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
সমর্থকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের পাশে রয়েছে। তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















