গত বছর বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাব কষে স্বস্তির জায়গায় ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, সামরিক কুচকাওয়াজে নতুন বিশ্বব্যবস্থার বার্তা এবং পানামা খালের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে চীনা কোম্পানির অবস্থান ধরে রাখার সাফল্য তাকে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। কিন্তু নতুন বছরে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি এখন সি চিনপিংয়ের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
লাতিন আমেরিকায় চীনের ধাক্কা
ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর পতন চীনের জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা। দক্ষিণ আমেরিকায় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হারানোর পাশাপাশি অঞ্চলটিতে অস্ত্র রপ্তানি ও জ্বালানি স্বার্থও ঝুঁকিতে পড়েছে। ভেনেজুয়েলা থেকে চীন যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন অনিশ্চিত। পাশাপাশি কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণ আদায় নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পশ্চিম গোলার্ধে চীনা প্রভাব কমানোর ঘোষণা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ, স্যাটেলাইট স্থাপনা এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অস্থিরতা
ইরানেও পরিস্থিতি চীনের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের ফলে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বিস্তারে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তেল আমদানিতেও দেশটির অবদান বড়। সেখানে অস্থিরতা দীর্ঘ হলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল
চীনের নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন, ট্রাম্পের অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই একাধিক সংকটে জড়িয়ে ফেলবে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রাসী পদক্ষেপ হলে ন্যাটো ও ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা বেইজিংয়ের কাছে কূটনৈতিকভাবে লাভজনক। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, ট্রাম্পকে খুশি রাখলেও ভবিষ্যতে তার অবস্থান নরম হবে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত চীন আরও ছাড় দিতে অনিচ্ছুক।

চীনের সীমাবদ্ধতা ও বিকল্প হাতিয়ার
লাতিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা চীনের নেই। অস্ত্র রপ্তানিও তুলনামূলকভাবে সীমিত। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, চীনা প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। তবু চীনের হাতে অন্য কৌশল আছে। ভেনেজুয়েলার তেল খাতে চীনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যা উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকেও পরোক্ষভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, নজরদারি ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রযুক্তিতে চীনা কোম্পানির উপস্থিতিও দেশটিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতেও চীন নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, নজরদারি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সরকারগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়াতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করাও বেইজিংয়ের পরিচিত কৌশল। ইরানেও নজরদারি প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে চীনা সহায়তা চলমান থাকার ইঙ্গিত মিলছে, যা দেশটির সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করছে।

বিপজ্জনক সংঘাতের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ব্যাহত করতে ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। যদিও চীন সরাসরি সহায়তার কথা অস্বীকার করে, তবু প্রযুক্তি ও তথ্য সরবরাহের অভিযোগ ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় প্রকাশ্য সংঘাতে গেলে চীনের জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি।
এপ্রিলের বৈঠক ও বড় দোটানা
চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল আগের চেয়ে ভিন্ন ও দ্রুত। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক অভিযান দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি ও সীমিত অভিযানের পথ বেছে নিচ্ছে। এর প্রভাব পড়বে এপ্রিল মাসে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকে। বাণিজ্য চুক্তি ও তাইওয়ান প্রশ্নে সমঝোতার আশা থাকলেও, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি সব হিসাব বদলে দিতে পারে।

ভবিষ্যৎ কৌশলের প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এ বছর আরও কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা বাড়াবে। এর খরচ চীনের জন্য সহনীয় হলেও, বিনিময়ে যদি নিজস্ব প্রভাব বলয় নিশ্চিত না হয়, তবে সি চিনপিংয়ের জন্য এটি বড় কৌশলগত ভুল হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য মেনে নিয়ে এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব হলে, বেইজিংয়ের বৈশ্বিক স্বপ্ন বড় ধাক্কা খাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















