ইউএনবি
সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলের বাঁধ প্রকল্পগুলো ঘিরে ঘুষ, নথি জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে বোরো ধান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বন্যা প্রতিরোধমূলক কাজ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
শাল্লা উপজেলার কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বাঁধ প্রকল্পগুলোকে কিছু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি লাভের ব্যবসায় পরিণত করেছেন। অনিয়মিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে তারা আগাম বন্যা থেকে হাওর রক্ষার জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ
সরকারি বিধি অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য থাকতে হবে, যাদের সবাই সংশ্লিষ্ট এলাকার জমির মালিক ও প্রকৃত উপকারভোগী কৃষক হবেন। কিন্তু কৃষকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটিগুলোতে কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের অর্থ নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি কার্যত নেই।
একজন কৃষক বলেন, বাঁধ নির্মাণকে তারা পুরোপুরি ব্যবসায় নামিয়ে এনেছে। কমিটিগুলো এখন শুধু লুটপাটের হাতিয়ার।
একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
প্রশাসনের কাছে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ১০৮, ১০৯, ১১৮, ১৪, ৩৩, ১৮, ১১৯, ৭০ ও ২২ নম্বরসহ একাধিক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকল্প এলাকার বাইরে থাকা, এমনকি জমির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিপরীতে প্রকৃত জমির মালিক ও কৃষকদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

কালীনি কোটা হাওরের ১০৮ নম্বর প্রকল্প
সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর একটি হলো কালীনি কোটা হাওরের অধীন ১০৮ নম্বর প্রকল্প, যেখানে হাওয়ার খাল থেকে সাপুরিয়া পাড়া পর্যন্ত বাঁধ সংস্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পের আওতায় থাকা জমির মালিক খন্দকার হাবিব বলেন, সব কাগজপত্র সময়মতো জমা দেওয়ার পরও ২ জানুয়ারি প্রকাশিত তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পুরো বাঁধ তাদের জমির ওপর দিয়ে গেছে এবং মাটি নিতে হলেও তাদের জমি ব্যবহার করতে হবে। সবকিছু সরেজমিনে দেখার পরও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। কৃষকদের ভাষ্য, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এটি করা হয়েছে।
আর্থিক লেনদেন ও জালিয়াতির অভিযোগ
উপজেলা পর্যায়ের একটি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য অভিযোগ করেন, বৈঠক শুরুর আগেই তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ২৫ ও ৯৩ নম্বর প্রকল্প থেকে অর্থ লেনদেন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও প্রকল্পগুলো স্থগিত করা হয়নি। শুধু ৪৫ ও ৯৮ নম্বর প্রকল্প থেকেই তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, অন্যান্য প্রকল্প থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু কমিটি নেতার বিরুদ্ধে নথি জালিয়াতি ও ফৌজদারি মামলার অভিযোগ রয়েছে। ৭০ নম্বর প্রকল্পের কমিটির চেয়ারম্যান প্রদীপ চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা চলমান। কৃষকদের দাবি, তিনি ইতিমধ্যে বিক্রি করে দেওয়া জমির মালিকানা নথি জাল করে কমিটির পদ পেয়েছেন।
বাইরের লোক দিয়ে কমিটি, ক্ষতির দায় কৃষকের
নীতিমালা অনুযায়ী স্থানীয় অংশগ্রহণ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও, কৃষকদের অভিযোগ—কয়েকটি প্রকল্পে পাশের উপজেলার লোকজনকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এতে জবাবদিহি দুর্বল হচ্ছে এবং নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। এক কৃষক বলেন, বাইরের লোক টাকা নিয়ে চলে যাবে। বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্ট হলে ক্ষতি হবে আমাদেরই।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন, চলতি বছর দুর্নীতির মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। হাওরাঞ্চলের কৃষি বছরে একবারের ফসলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাঁধ ভেঙে পড়লে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

কৃষকেরা শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কাবিটা কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিতর্কিত কমিটি বাতিল করে নতুন করে গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, অভিযোগগুলো পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাঁধ নির্মাণের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সরকারি অর্থের পাশাপাশি তাদের ফসলও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















