এই মাসের শুরুতে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। পোস্টটিতে এক জন পাত্রের কথা বলা হয়, যাঁর সব গুণই যেন নিখুঁত। নিজের গাড়ি রয়েছে, হাসপাতালের স্থায়ী চাকরি, বাবা-মায়ের অবসর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত, ধূমপান বা মদ্যপান নেই, রান্না জানেন এবং স্বভাব শান্ত। প্রশ্ন ছিল, এমন একজন যদি কনের পরিবারে বিয়ে করতে আসেন, তবে চীনের বিয়ের বাজারে তাঁর দাম কত হওয়া উচিত।
পোস্টে শুরুতে কোথাও বলা হয়নি, এই বর্ণনা আসলে একজন পুরুষের নয়। মন্তব্যের ঘরে দ্রুত ভিড় জমে যায়। কেউ লেখেন, এমন পাত্রের দাম কোটি কোটি ইউয়ান হওয়া উচিত। কেউ বলেন, তিনি কেবল বড় কোনও হাসপাতালের পরিচালকের মেয়ের জন্যই যোগ্য। পরে যখন লেখক জানালেন, এই ‘আদর্শ পাত্র’ আসলে তিনি নিজেই, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। কিন্তু ততক্ষণে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এসে গেছে। যে গুণগুলো একজন পুরুষের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর বলে ধরা হচ্ছে, সেগুলো নারীদের কাছে প্রায় বাধ্যতামূলক প্রত্যাশা।

ইতিহাসে বিয়ে ও লেনদেনের সম্পর্ক
চীনের ইতিহাসে বিয়ে কখনও শুধু প্রেমের বিষয় ছিল না। পরিবার, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান বরাবরই বড় ভূমিকা রেখেছে। গ্রামাঞ্চলে আজও অনেক জায়গায় কনের মূল্য দেওয়ার রীতি চালু আছে। তবে উনিশশো ছিয়াত্তরে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মানুষ নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পায়। দুই হাজার এক সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, বারো শতাংশেরও কম মানুষ প্রেম ছাড়া বিয়েতে রাজি ছিলেন।
প্রেমের জায়গায় বাস্তবতার হিসাব
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র আবার বদলেছে। সাংহাইয়ে এখন প্রায় এক চতুর্থাংশ পুরুষ ও নারীর মত, ভালোবাসা না থাকলেও বিয়ে করা যায়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই পরিবর্তনের বড় কারণ। উচ্চশিক্ষা আর ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। তরুণদের বেকারত্ব বেড়েছে। অনেক পরিবার এখনও আশা করে, বরকে নিজের বাড়ির মালিক হতে হবে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ বিয়ের সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করে তুলছে।

পরিবারের অনুমোদন ও সামাজিক চাপ
এই অবস্থায় তরুণরা সাবধানে পা ফেলছে। সাংহাইয়ে অবিবাহিত তরুণীদের প্রায় অর্ধেকই বলেন, বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া তাঁরা বিয়েতে রাজি নন। সামাজিক প্রত্যাশা আর পারিবারিক চাপ অনেককেই সিদ্ধান্তহীন করে তুলছে।
বিয়ে থেকে দূরে সরে যাওয়া প্রজন্ম
অনেকে এই চাপ এড়িয়ে চলার পথ বেছে নিচ্ছেন। দুই হাজার পঁচিশ সালের প্রথম তিন মাসে বিয়ে নিবন্ধন করেছেন মাত্র আঠারো লক্ষ জুটি, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। পঁচিশ থেকে ঊনত্রিশ বছর বয়সীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখনও অবিবাহিত। এই প্রবণতা সরকারকে উদ্বিগ্ন করছে, কারণ চীনে প্রায় সব শিশুই বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই জন্ম নেয়। সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জন্মহার নেমে এসেছে ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কর্তৃপক্ষ চাইছে হতাশা নয়, উদযাপন। কিন্তু বিয়ের বাজারের এই বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে সমাজের ভিতরে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















