চীনের সর্বত্র এখন শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার ছাপ। সর্বশেষ উদাহরণ মিলেছে জানুয়ারির মাঝামাঝি, যখন কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা জানায়, গত এক বছরে প্রায় দশ লাখ কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদর্শিক কর্তৃত্ব। শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা সংবিধানে যুক্ত, পার্টির সর্বস্তরের কর্মকর্তারা তাঁকে কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে আনুগত্য প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে তাঁর বক্তব্য, আর শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাঁর রচনার নতুন খণ্ড প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত।
আজ এসব আর কাউকে বিস্মিত করে না। কিন্তু শুরুতে এই পরিবর্তনগুলো চীন বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছিল। দীর্ঘদিনের সমষ্টিগত নেতৃত্বের ধারা ভেঙে দেশটি আবার শক্ত হাতে শাসনের দিকে ফিরছে, এমন ধারণা তখনই স্পষ্ট হয়। আধুনিক চীনের উত্থান শুরু হয়েছিল দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির মাধ্যমে। শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর সেই গতিপথে এক নতুন মোড় দেখা দেয়, যাকে সরকারিভাবে বলা হয় নতুন যুগ।

অনেকে শি জিনপিংকে সংস্কারের বিপরীত প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাঁদের মতে, আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় কড়াকড়ি আবার জীবনের সব ক্ষেত্রে ফিরে এসেছে। তবে চীন বিশেষজ্ঞ মিনশিন পেইয়ের নতুন বই ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তাঁর মতে, দেং ও শির মধ্যে শুধু বিচ্ছিন্নতা নয়, রয়েছে গভীর ধারাবাহিকতা। দেংয়ের সময় নেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ শাসনের পথ তৈরি করেছে। দুই নেতার মিলের জায়গা একটাই, পার্টির কর্তৃত্বকে যে কোনো মূল্যে শক্ত করা।
শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া। ২০১৮ সালে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি এখন তৃতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি অবস্থান করছেন। আগে দুই মেয়াদই ছিল অলিখিত সর্বোচ্চ সীমা। এই পরিবর্তনের শিকড়ও দেংয়ের সময়েই। আশির দশকে দেং পার্টির শীর্ষ পর্যায়ে বয়স ও মেয়াদসীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেননি, কারণ তা তাঁর নিজের ক্ষমতাকেই খর্ব করত।

শি জিনপিংয়ের হাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে, পার্টি প্রধান, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও রাষ্ট্রপতি। এর মধ্যে শুধু রাষ্ট্রপতির পদেই মেয়াদসীমা ছিল, আর সেটিই ছিল সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। আগেও দেখা গেছে, শীর্ষ নেতারা এক পদ ছাড়লেও অন্য ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। ফলে কঠোর নিয়মের চেয়ে দুর্বল প্রথাই শি জিনপিং উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন। সেই প্রথা ভাঙা ছিল সময়ের অপেক্ষা।
অর্থনীতিতেও শি জিনপিংয়ের শাসনে দেংয়ের ছায়া স্পষ্ট। দেংকে অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে উদার বলা হলেও তিনি আদতে ছিলেন রাজনৈতিকভাবে কঠোর। পার্টির কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হলেই তিনি নির্মম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য কখনোই পুরোপুরি বাজারভিত্তিক অর্থনীতি গড়া ছিল না, বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ও পার্টির শক্তি বাড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। সেই কারণেই চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং আইনের শাসন ও পুঁজিবাজার আজও পার্টির অধীন।
এই কাঠামোর ওপর ভর করেই শি জিনপিং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত খাতকে আরও শক্ত করেছেন। আবাসন খাতের বড় কোম্পানিগুলোর ঋণ বন্ধ করা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ তার উদাহরণ। তাঁর শাসনে স্পষ্ট বার্তা, বেসরকারি খাত যত বড়ই হোক, পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দেং ও শির মূল পার্থক্য পরিস্থিতিতে। দেং ক্ষমতায় এসেছিলেন মাও-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে গিয়ে, যেখানে অন্য বিপ্লবী নেতাদের উপস্থিতি তাঁকে সীমিত করেছিল। শি জিনপিংয়ের সামনে সেই বাধা কম। অর্থনৈতিক সাফল্যের পর পার্টি ও রাষ্ট্রকে শিথিল মনে করে তিনি কঠোর শাসনের পথে হাঁটছেন। দলীয় ভারসাম্যের স্থবিরতা ভেঙে তিনি দেখিয়েছেন, দৃঢ় নেতা চাইলে সব বাধা অতিক্রম করতে পারেন।
মিনশিন পেইয়ের মতে, দেং শিয়াওপিং আজ বেঁচে থাকলে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা দেখে ঈর্ষা করতেন। শিল্প ও সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে পার্টির দখল মজবুত করা ছিল দেংয়ের স্বপ্ন। সমালোচকদের চোখে শি জিনপিং চীনকে পেছনে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেং ও তাঁর উত্তরসূরিরা চীনকে যতটা সামনে নেওয়ার আশা তৈরি করেছিলেন, ততটা এগোতে দেননি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















