০৮:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তিতে বাধা শেখ হাসিনার সঙ্গে তিশার ছবি জাদুঘরে রাখার প্রস্তাব, শাওনের কটাক্ষে তোলপাড় শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি বাড়ল, সূচকের উত্থানে ফিরল বিনিয়োগকারীদের আস্থা আইসিসির প্রত্যাখ্যান, বিশ্বকাপ থেকে বাদ বাংলাদেশ ১,৩০০ কোটি টাকার জিকে সেচ পুনর্বাসন প্রকল্পে নতুন প্রাণ পাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি আফ্রিকার খাদ্যবাজারের অদৃশ্য শক্তি: মহাদেশের ভেতরের বাণিজ্য যতটা ভাবা হয় তার চেয়ে অনেক বড় গাজায় শান্তিতে বিরক্ত ট্রাম্প, বোর্ডের রাজনীতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ইরানের রক্তাক্ত দমন-পীড়নের পর ক্ষমতার ভেতরে ফাটল, বাড়ছে শাসনব্যবস্থার অস্থিরতা ফরিদপুরে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ বুড়ো কৃষকের ভারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি: উন্নয়নের সামনে নতুন সতর্কবার্তা

মোদির নতুন বাস্তববাদ, চাপেই বদলের রাজনীতি

ভারতের রাজনীতিতে ২০২৪ সালটি নরেন্দ্র মোদির জন্য ছিল এক বড় ধাক্কার বছর। জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোট সরকার গঠনে বাধ্য হয় তাঁর দল। এর পরের প্রায় এক বছর নীতিনির্ধারণে ছিল ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফের ক্ষমতায় আসা মোদির জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করে, যার মোট পরিমাণ এখন প্রায় পঞ্চাশ শতাংশে পৌঁছেছে।

রাজনৈতিক চাপে বদলে যাওয়া কৌশল

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিই যেন মোদিকে আরও বাস্তববাদী করে তুলেছে। জোট শরিকদের সন্তুষ্ট রাখার প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক চাপ তাঁকে আগের তুলনায় হিসাবি পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। নির্বাচনী ধাক্কার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ অনেকটাই কমেছে। বিভাজনের ভাষা পুরোপুরি না ছাড়লেও, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই আগ্রাসন আগের মতো চোখে পড়ছে না। তার বদলে অর্থনৈতিক সংস্কারেই মনোযোগ বাড়িয়েছে সরকার।

India becomes world's 4th largest economy, to surpass Germany in next 2-3  years: Govt| India News

অর্থনীতির গতি ধরে রাখার চেষ্টা

সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি প্রায় সাত দশমিক চার শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এই গতিতে চললে খুব শিগগিরই জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এমনকি ২০২৮ সালের মধ্যে জার্মানিকেও পেছনে ফেলতে পারে ভারত। দীর্ঘদিনের উৎপাদনমুখী নীতির ফলও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত স্মার্টফোনের একটি বড় অংশ এখন ভারতেই সংযোজন হচ্ছে।

সংস্কারের পথে ছোট ছোট পদক্ষেপ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেউলিয়া আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘসূত্রতা কমে। পণ্য ও পরিষেবা কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমানোর কাজ চলছে, যেখানে একই পণ্যের ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারের বিভ্রান্তি ছিল। প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ কমাতে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার। সামান্য কাগুজে ভুলে কঠোর শাস্তির মতো নিয়ম শিথিল করার কথা বলা হচ্ছে।

শ্রম আইন ও বিদ্যুৎ খাতে পরিবর্তন

গত নভেম্বর মাসে শ্রম আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ছোট আকারে থেকে যাওয়ার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ টানার জন্য নতুন আইনের খসড়া তৈরি হচ্ছে। পুরোনো অবকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে সক্রিয়তা

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারত বেশ সক্রিয়। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ের পর যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের সঙ্গে বড় চুক্তির ঘোষণাও আসতে পারে। কানাডার সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। বিমা ও পারমাণবিক শক্তি খাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দরজা আরও খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও বরফ গলছে

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে গত বছর বহুদিন পর মোদি ও শি চিন পিংয়ের বৈঠক হয়। সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। বিনিয়োগ ও ভিসা সংক্রান্ত কঠোরতা ধীরে ধীরে শিথিল করা হচ্ছে, কারণ ভারত বুঝতে পারছে, প্রযুক্তি ও পুঁজির জন্য চীনের গুরুত্ব উপেক্ষা করা কঠিন।

India's Modi meets Xi on his first China trip in seven years as Trump's  tariffs bite | CNN

সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে বড় জয়ের ফলে ক্ষমতাসীন দলের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও কিছুটা অনুকূল হয়েছে। তবে আশঙ্কা রয়েছে, চাপ কমলে সংস্কারের গতি আবার শ্লথ হতে পারে। অনেক সংস্কারই এখনও অসম্পূর্ণ। কৃষি খাত ও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে কঠিন হওয়ায় আটকে আছে। শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, শহরের দূষণ ও যানজটও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

চ্যালেঞ্জের মাঝেই সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্র যখন আরও সুরক্ষাবাদী পথে হাঁটছে, তখন ভারতের এই সংস্কারমুখী অবস্থান প্রশংসার দাবিদার। ভোটের ধাক্কা কিংবা শুল্কযুদ্ধের জবাবে মোদি চাইলে আরও কট্টর হতে পারতেন। কিন্তু তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। শক্তিশালী অর্থনীতিই যে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি, তা ভারতের মানুষও বুঝতে শুরু করেছে। এই পথ ধরে থাকাই এখন মোদির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তিতে বাধা

মোদির নতুন বাস্তববাদ, চাপেই বদলের রাজনীতি

০৬:২০:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের রাজনীতিতে ২০২৪ সালটি নরেন্দ্র মোদির জন্য ছিল এক বড় ধাক্কার বছর। জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোট সরকার গঠনে বাধ্য হয় তাঁর দল। এর পরের প্রায় এক বছর নীতিনির্ধারণে ছিল ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফের ক্ষমতায় আসা মোদির জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করে, যার মোট পরিমাণ এখন প্রায় পঞ্চাশ শতাংশে পৌঁছেছে।

রাজনৈতিক চাপে বদলে যাওয়া কৌশল

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিই যেন মোদিকে আরও বাস্তববাদী করে তুলেছে। জোট শরিকদের সন্তুষ্ট রাখার প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক চাপ তাঁকে আগের তুলনায় হিসাবি পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। নির্বাচনী ধাক্কার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ অনেকটাই কমেছে। বিভাজনের ভাষা পুরোপুরি না ছাড়লেও, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই আগ্রাসন আগের মতো চোখে পড়ছে না। তার বদলে অর্থনৈতিক সংস্কারেই মনোযোগ বাড়িয়েছে সরকার।

India becomes world's 4th largest economy, to surpass Germany in next 2-3  years: Govt| India News

অর্থনীতির গতি ধরে রাখার চেষ্টা

সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি প্রায় সাত দশমিক চার শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এই গতিতে চললে খুব শিগগিরই জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এমনকি ২০২৮ সালের মধ্যে জার্মানিকেও পেছনে ফেলতে পারে ভারত। দীর্ঘদিনের উৎপাদনমুখী নীতির ফলও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত স্মার্টফোনের একটি বড় অংশ এখন ভারতেই সংযোজন হচ্ছে।

সংস্কারের পথে ছোট ছোট পদক্ষেপ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেউলিয়া আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘসূত্রতা কমে। পণ্য ও পরিষেবা কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমানোর কাজ চলছে, যেখানে একই পণ্যের ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারের বিভ্রান্তি ছিল। প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ কমাতে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার। সামান্য কাগুজে ভুলে কঠোর শাস্তির মতো নিয়ম শিথিল করার কথা বলা হচ্ছে।

শ্রম আইন ও বিদ্যুৎ খাতে পরিবর্তন

গত নভেম্বর মাসে শ্রম আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ছোট আকারে থেকে যাওয়ার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ টানার জন্য নতুন আইনের খসড়া তৈরি হচ্ছে। পুরোনো অবকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে সক্রিয়তা

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারত বেশ সক্রিয়। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ের পর যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের সঙ্গে বড় চুক্তির ঘোষণাও আসতে পারে। কানাডার সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। বিমা ও পারমাণবিক শক্তি খাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দরজা আরও খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও বরফ গলছে

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে গত বছর বহুদিন পর মোদি ও শি চিন পিংয়ের বৈঠক হয়। সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। বিনিয়োগ ও ভিসা সংক্রান্ত কঠোরতা ধীরে ধীরে শিথিল করা হচ্ছে, কারণ ভারত বুঝতে পারছে, প্রযুক্তি ও পুঁজির জন্য চীনের গুরুত্ব উপেক্ষা করা কঠিন।

India's Modi meets Xi on his first China trip in seven years as Trump's  tariffs bite | CNN

সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে বড় জয়ের ফলে ক্ষমতাসীন দলের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও কিছুটা অনুকূল হয়েছে। তবে আশঙ্কা রয়েছে, চাপ কমলে সংস্কারের গতি আবার শ্লথ হতে পারে। অনেক সংস্কারই এখনও অসম্পূর্ণ। কৃষি খাত ও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে কঠিন হওয়ায় আটকে আছে। শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, শহরের দূষণ ও যানজটও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

চ্যালেঞ্জের মাঝেই সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্র যখন আরও সুরক্ষাবাদী পথে হাঁটছে, তখন ভারতের এই সংস্কারমুখী অবস্থান প্রশংসার দাবিদার। ভোটের ধাক্কা কিংবা শুল্কযুদ্ধের জবাবে মোদি চাইলে আরও কট্টর হতে পারতেন। কিন্তু তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। শক্তিশালী অর্থনীতিই যে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি, তা ভারতের মানুষও বুঝতে শুরু করেছে। এই পথ ধরে থাকাই এখন মোদির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।