গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে আলোচনায় নতুন মাত্রা এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি আটটি তথাকথিত অমীমাংসিত যুদ্ধের ইতি টেনেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই দাবি বাড়িয়ে বলা হলেও গাজার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেওয়া, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং জিম্মিদের মুক্তিতে হামাসকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট ও কার্যকর।
তবে এই সাফল্য ছিল শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। বিশ দফার শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা থাকলেও তিন মাস পেরিয়ে বাস্তবে অগ্রগতি প্রায় নেই বললেই চলে। জানুয়ারির মাঝামাঝি গাজার প্রশাসনের জন্য একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইসরায়েল তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে এই কমিটির বাস্তব ক্ষমতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

গাজায় শান্তির পথে বাধা এখনও গভীর
গাজার পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত জটিল। হামাস তাদের হাতে থাকা অস্ত্র ছাড়তে বা গাজার ওপর প্রভাব খর্ব করতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে আরও সেনা প্রত্যাহারে অনিচ্ছুক। গাজার বড় একটি অংশ এখনও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং মাঝে মধ্যে সেখানে প্রাণঘাতী হামলা ও চলছে। হামাস সক্রিয় থাকা অবস্থায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায় না ইসরায়েল।
প্রথম ধাপে সাফল্যের পেছনে ট্রাম্পের কৌশল
প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ট্রাম্প দুই পক্ষের ওপর সরাসরি ও স্পষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর ব্যক্তিগত চাপ এবং হামাসের ক্ষেত্রে কাতার ও তুরস্কের মতো মিত্রদের মাধ্যমে প্রভাব খাটানো হয়। কেউ দ্বিধায় পড়লে তিনি আগেভাগেই ঘোষণা দিতেন যে সমঝোতা হয়ে গেছে, বিরোধিতা করার সাহস যেন না থাকে। এই আগ্রাসী কৌশল দুই বছরের কূটনীতির ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সফল হয়েছিল। কিন্তু এরপর গাজার প্রতি তাঁর মনোযোগ কমে আসে।

নতুন বোর্ড কি শান্তি নয়, বিভ্রান্তির উৎস
সম্প্রতি ঘোষিত তিনটি নতুন শান্তি সংস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গাজার তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত নির্বাহী বোর্ডে এমন লোকজন বেশি, যারা মানবিক সংকট নয় বরং ব্যবসায়িক সুযোগ খোঁজায় অভ্যস্ত। সেখানে একজন ফিলিস্তিনি ও নেই। এর ওপরে থাকবে তথাকথিত শান্তি বোর্ড, যেখানে সদস্য হতে বিপুল অর্থ দিতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকবে ট্রাম্পের হাতে। এই কাঠামো শান্তির চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রদর্শনীর মতোই বেশি মনে হচ্ছে।
গাজার বাস্তবতা এখনও ভয়াবহ
বাস্তবে গাজা আজও দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকে হামাসের কর্তৃত্ব। এই পরিস্থিতিতে প্রায় বিশ লক্ষ মানুষ গৃহহীন, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে দিন কাটাচ্ছে। এমন পরিবেশেই নতুন সংঘাতের বীজ জন্ম নিতে পারে। এই সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষমতা কার্যত ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে, কারণ তিনিই দুই পক্ষকে পরবর্তী ধাপে বাধ্য করতে পারেন।

দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নই এখন জরুরি
গাজার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে হলে দ্বিতীয় ধাপ অবিলম্বে কার্যকর করা দরকার। গাজার প্রশাসনিক কমিটিকে সেখানে প্রবেশ ও কাজের সুযোগ দিতে হবে, পুনর্গঠনের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন, হামাস যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণের যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এই ধাপের মূল শর্ত। একই সঙ্গে গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও নির্মাণসামগ্রী প্রবেশের পথ খুলে দিতে হবে।
শান্তির সাফল্যই ট্রাম্পের আসল পরীক্ষা
এই সব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সহজ নয়, এমনকি ট্রাম্পের চাপের কৌশল থাকলেও। তবু গাজার দিকে মনোযোগ ফেরানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেখানে সফলতা আসলে সেটিই হবে তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















