০৮:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তিতে বাধা শেখ হাসিনার সঙ্গে তিশার ছবি জাদুঘরে রাখার প্রস্তাব, শাওনের কটাক্ষে তোলপাড় শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি বাড়ল, সূচকের উত্থানে ফিরল বিনিয়োগকারীদের আস্থা আইসিসির প্রত্যাখ্যান, বিশ্বকাপ থেকে বাদ বাংলাদেশ ১,৩০০ কোটি টাকার জিকে সেচ পুনর্বাসন প্রকল্পে নতুন প্রাণ পাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি আফ্রিকার খাদ্যবাজারের অদৃশ্য শক্তি: মহাদেশের ভেতরের বাণিজ্য যতটা ভাবা হয় তার চেয়ে অনেক বড় গাজায় শান্তিতে বিরক্ত ট্রাম্প, বোর্ডের রাজনীতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ইরানের রক্তাক্ত দমন-পীড়নের পর ক্ষমতার ভেতরে ফাটল, বাড়ছে শাসনব্যবস্থার অস্থিরতা ফরিদপুরে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ বুড়ো কৃষকের ভারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি: উন্নয়নের সামনে নতুন সতর্কবার্তা

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পিছু হটা, কিন্তু ভাঙা আস্থা কি আর জোড়া লাগবে

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে সুইজারল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আবারও গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের কথা তুলে ধরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রই নাকি এই বিশাল বরফে ঢাকা ভূখণ্ডকে রক্ষা ও উন্নত করতে সক্ষম। সেই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুর পাল্টান তিনি। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ভবিষ্যৎ এক সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছে বলে ঘোষণা দেন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেন।

এই পিছু হটার ফলে আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়ানো গেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই ঘটনায় যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা কি আদৌ মুছে ফেলা সম্ভব।

হুমকি থেকে আপসের পথে

গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান গত কয়েক সপ্তাহে ছিল আগ্রাসী। ডেনমার্কসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি কার্যত চাপের রাজনীতি শুরু করেছিলেন। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে না এলে শুল্ক আরও বাড়ানোর কথাও বলেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। বিস্তারিত চুক্তির বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। আলোচনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর। তবু এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয়, আপাতত অন্তত ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না ট্রাম্প।

ন্যাটোর ভিত নড়ে গেল কেন

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে ন্যাটোর ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এই সামরিক জোটে যুক্তরাষ্ট্রই মূল ভরকেন্দ্র। ইউরোপের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।

একজন ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো ভাবতে শুরু করেছে, সত্যিই কি প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে। ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতির ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু ইউরোপেই নয়, এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অর্থনীতি ও বাজারের চাপ

ট্রাম্পের হঠাৎ নরম হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অর্থনৈতিক চাপ। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ঘিরে উত্তেজনা বাড়তেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ও মুদ্রা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংঘাতের আশঙ্কা কমতেই বাজার আবার স্থিতিশীল হয়।

Donald Trump's expansionist itch has undermined global security

এতে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে বুঝেই শেষ মুহূর্তে পিছু হটেছেন ট্রাম্প।

ইউরোপের পাল্টা প্রস্তুতি

এই সংকট ইউরোপকে ভাবতে বাধ্য করেছে নিজেদের শক্তি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ইউরোপের ভেতরে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা জোরালো হয়েছে।

কিছু দেশ পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু করেছে, যা আগে ছিল প্রায় নিষিদ্ধ বিষয়। ইউক্রেনকে সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপ কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সেই প্রস্তুতিও নীরবে এগোচ্ছে।

থামল, কিন্তু শেষ নয়

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান আপাতত থেমেছে। কিন্তু এটি যে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জনমত ও কংগ্রেসের আপত্তি সত্ত্বেও তাঁর সমর্থকদের বড় একটি অংশ এই ধরনের সম্প্রসারণবাদকে সমর্থন করে।

ফলে ইউরোপীয় নেতারা জানেন, এই ইস্যু আবারও ফিরে আসতে পারে। তখন আবারও জনমতের চাপ আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।

আস্থার ক্ষয়, নিরাপত্তার প্রশ্ন

এই পুরো সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক কতটা গভীরভাবে জড়িত, আবার কতটা ভঙ্গুরও। সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে আলাদা হওয়া সহজ নয়। তবু একবার আস্থা নড়বড়ে হলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আপাতত শান্ত। কিন্তু বরফের নিচে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তিতে বাধা

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পিছু হটা, কিন্তু ভাঙা আস্থা কি আর জোড়া লাগবে

০৬:৩৩:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে সুইজারল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আবারও গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের কথা তুলে ধরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রই নাকি এই বিশাল বরফে ঢাকা ভূখণ্ডকে রক্ষা ও উন্নত করতে সক্ষম। সেই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুর পাল্টান তিনি। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ভবিষ্যৎ এক সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছে বলে ঘোষণা দেন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেন।

এই পিছু হটার ফলে আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়ানো গেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই ঘটনায় যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা কি আদৌ মুছে ফেলা সম্ভব।

হুমকি থেকে আপসের পথে

গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান গত কয়েক সপ্তাহে ছিল আগ্রাসী। ডেনমার্কসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি কার্যত চাপের রাজনীতি শুরু করেছিলেন। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে না এলে শুল্ক আরও বাড়ানোর কথাও বলেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। বিস্তারিত চুক্তির বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। আলোচনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর। তবু এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয়, আপাতত অন্তত ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না ট্রাম্প।

ন্যাটোর ভিত নড়ে গেল কেন

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে ন্যাটোর ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এই সামরিক জোটে যুক্তরাষ্ট্রই মূল ভরকেন্দ্র। ইউরোপের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।

একজন ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো ভাবতে শুরু করেছে, সত্যিই কি প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে। ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতির ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু ইউরোপেই নয়, এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অর্থনীতি ও বাজারের চাপ

ট্রাম্পের হঠাৎ নরম হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অর্থনৈতিক চাপ। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ঘিরে উত্তেজনা বাড়তেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ও মুদ্রা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংঘাতের আশঙ্কা কমতেই বাজার আবার স্থিতিশীল হয়।

Donald Trump's expansionist itch has undermined global security

এতে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে বুঝেই শেষ মুহূর্তে পিছু হটেছেন ট্রাম্প।

ইউরোপের পাল্টা প্রস্তুতি

এই সংকট ইউরোপকে ভাবতে বাধ্য করেছে নিজেদের শক্তি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ইউরোপের ভেতরে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা জোরালো হয়েছে।

কিছু দেশ পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু করেছে, যা আগে ছিল প্রায় নিষিদ্ধ বিষয়। ইউক্রেনকে সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপ কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সেই প্রস্তুতিও নীরবে এগোচ্ছে।

থামল, কিন্তু শেষ নয়

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান আপাতত থেমেছে। কিন্তু এটি যে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জনমত ও কংগ্রেসের আপত্তি সত্ত্বেও তাঁর সমর্থকদের বড় একটি অংশ এই ধরনের সম্প্রসারণবাদকে সমর্থন করে।

ফলে ইউরোপীয় নেতারা জানেন, এই ইস্যু আবারও ফিরে আসতে পারে। তখন আবারও জনমতের চাপ আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।

আস্থার ক্ষয়, নিরাপত্তার প্রশ্ন

এই পুরো সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক কতটা গভীরভাবে জড়িত, আবার কতটা ভঙ্গুরও। সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে আলাদা হওয়া সহজ নয়। তবু একবার আস্থা নড়বড়ে হলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আপাতত শান্ত। কিন্তু বরফের নিচে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।