২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রত্যাশিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে এক সময় চাপে পড়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। টানা এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা এই নেতাকে তখন আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। জোট সরকার সংস্কারে আগ্রহ দেখাচ্ছিল না, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছিলেন, মোদির উত্থানের চূড়া বুঝি পেরিয়ে গেছে। এমনকি দলীয় ভেতরেও ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি নিয়ে হিসাব শুরু হয়েছিল।
কিন্তু মাত্র ষোল মাসের ব্যবধানে চিত্র বদলে গেছে। একের পর এক রাজ্য নির্বাচনে জয় পেয়েছে শাসক জোট, আর বিরোধীরা পড়েছে বিশৃঙ্খলায়। কেন্দ্র সরকার আবার সক্রিয় হয়েছে সংস্কারের পথে। পণ্য ও পরিষেবা করব্যবস্থার জটিলতা কমানো হয়েছে, শ্রম আইন সংস্কার করা হয়েছে, পারমাণবিক খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক্স শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে, বাণিজ্য চুক্তির কথাবার্তাও এগোচ্ছে। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করছে ভারতের অর্থনীতি।
দ্বাদশ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা পঁচাত্তর বছর বয়সী মোদি এখন আবার তাকিয়ে আছেন ২০২৯ সালের নির্বাচনের দিকে। লক্ষ্য আরও দীর্ঘমেয়াদি। ২০৩১ সালে জওহরলাল নেহরুর টানা প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও সামনে। একই সঙ্গে তিনি নিজের উত্তরাধিকার নিয়েও ভাবছেন। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বিষয়টি এখনও তাঁর রাজনীতির অংশ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জোর পড়েছে অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানোর ওপর। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর লক্ষ্যই এখন তাঁর প্রধান বার্তা।
২০২৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল খতিয়ে দেখে বিজেপি দ্রুত বাস্তবতা মেনে নেয়। লোকসভায় দলের আসন সংখ্যা কমলেও ভোটের শতাংশ খুব বেশি কমেনি। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম, বিশেষ করে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ভোটে প্রভাব ফেলেছিল। এরপর খাদ্য সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সরকার হস্তক্ষেপ বাড়িয়েছে।
তবে আদর্শিক প্রশ্নে বিজেপি পিছু হটেনি। সভা-সমাবেশে এখনও বিভাজনমূলক বক্তব্য শোনা যায়, যদিও বড় ধরনের নতুন উত্তেজনাকর উদ্যোগ আপাতত থামিয়ে রাখা হয়েছে। একসময় যে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা জোরেশোরে উঠছিল, সেটিও এখনো বাস্তবায়নের পথে যায়নি।

আন্তর্জাতিক চাপও মোদির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত সামরিক সংঘর্ষ তাঁকে শক্ত হাতে নেতৃত্বের সুযোগ দেয়। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ভারতীয় রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি করলেও দেশজুড়ে মোদির কঠোর অবস্থান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিদেশি চাপকে তিনি কাজে লাগাচ্ছেন অভ্যন্তরীণ সংস্কারের যুক্তি হিসেবে, শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা ও বিদ্যুতের খরচ কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
জোট সরকার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলো সুবিধা ও প্রভাবের বিনিময়ে কেন্দ্রকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। বিরোধীদের দুর্বলতা সরকারের জন্য সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ করেছে। শ্রম আইন পরিবর্তন ঘিরে বড় ধরনের আন্দোলনও দেখা যায়নি।
তবে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিছু রাজ্যে ভোটের আগে আর্থিক সহায়তা প্রকল্প বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী কংগ্রেস ভোট কারচুপির অভিযোগ তুললেও ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তবু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস এখনও স্পষ্ট বিকল্প রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করাতে পারেনি। ফলে প্রায় সাতজনের মধ্যে পাঁচজন ভারতীয় এখনও মোদিকে সমর্থন করছেন।
সামনে কেরালা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে নির্বাচন। বেকারত্ব ও গিগ কর্মীদের অসন্তোষ সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে মোদিই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর তৃতীয় মেয়াদ যদি অর্থনৈতিক গতি বাড়াতে পারে, তাহলে সেটিই হয়তো তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















