উগান্ডার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে যে আতঙ্ক আর দমন-পীড়নের ছায়া নেমে এসেছে, তার কেন্দ্রে এখন বিরোধী নেতা ববি ওয়াইন। ভোটের ফলকে তিনি সরাসরি মিথ্যা আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, এই লড়াই শুধু নির্বাচন জয়ের নয়, দেশের মুক্তির। সেনাদের হাত থেকে কীভাবে তিনি নিজের বাড়ি থেকে পালিয়েছেন, তা প্রকাশ করেননি। কোথায় আছেন, সেটা অজানা। তবে ফোনে কথা বলার সময় তার কণ্ঠে স্পষ্ট ভয় আর প্রতিরোধের সংকল্প।
ভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন
গত পনেরো জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ববি ওয়াইন ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধী প্রার্থী। তার দাবি, ঘোষিত ফল বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগত। চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ইয়োয়েরি মুসেভেনি প্রায় বাহাত্তর শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে ঘোষণা করা হলেও দেশজুড়ে কোথাও উৎসবের আমেজ দেখা যায়নি। বরং অনেকের কাছে এই ফল আরও একবার প্রমাণ করেছে, ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন উগান্ডায় প্রায় অসম্ভব।

রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকে হুমকি
ভয়কে আরও ঘনীভূত করেছে সেনাপ্রধান মুয়োজি কাইনেরুগাবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য। ববি ওয়াইনকে হত্যার হুমকি, বিরোধী সমর্থকদের মৃত্যুকে তুচ্ছ করে দেখা এবং সহিংসতায় গর্ব প্রকাশ দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে এই সত্য যে সেনাপ্রধান নিজেই রাষ্ট্রপতির ছেলে। এতে নির্বাচন যে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছিল না, সেই ধারণা আরও শক্ত হয়েছে।
রাজপথে নীরবতা, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক
কাম্পালা শহরের রাস্তায় এখনো সেনা ও পুলিশের টহল চলছে। মানবাধিকার কর্মীদের ধারণা, ভোটের পর থেকে হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না, কারণ পুলিশ তথ্য প্রকাশ করছে না। অনেক নাগরিক সংগঠন স্থগিত, বহু কর্মী আত্মগোপনে। ববি ওয়াইনের দল জানিয়েছে, তাদের তিনজন শীর্ষ নেতা আটক। বিরোধী এক সংসদ সদস্যের বাড়িতে গোলাগুলিতে অন্তত সাতজন সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবাদের আগেই দমন
এই দমন-পীড়নের মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই তা থামিয়ে দেওয়া। ববি ওয়াইন আগেই বলেছিলেন, কেবল নির্বাচন দিয়ে পরিবর্তন আসবে না। তবে তিনি আত্মগোপনে থাকায় রাজধানীতে আপাতত বড় কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিনের বিরোধী নেতা কিজ্জা বেসিগিয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে, তার অসুস্থতার খবরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে বিরোধী শিবির কার্যত ছত্রভঙ্গ।
আঞ্চলিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রশ্ন
এই পরিস্থিতি শুধু উগান্ডার নয়। প্রতিবেশী তানজানিয়ায় গত বছর বিরোধী প্রার্থীকে কারাবন্দি করা হয়, বিক্ষোভ দমন করা হয় এবং প্রায় সর্বসম্মত ফল ঘোষণা করা হয়। কঙ্গো ও জিবুতিতেও সামনে নির্বাচন, কিন্তু সেখানকার ভোটারদের বড় অংশের আশা খুব কম। এসব দেশে নির্বাচন এখন ক্ষমতার শীর্ষে পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং পুরোনো এলিটদের পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া।
ভয়ের মধ্যেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা
অতীতে মুসেভেনি বিরোধীদের দমন বা নিজেদের পক্ষে টেনে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ববি ওয়াইনের ক্ষতি করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলেই অনেকে মনে করেন। তবু সেনাপ্রধানের প্রকাশ্য আগ্রাসী বক্তব্য সাধারণ মানুষের জন্য সামান্য ও স্বস্তির নয়। এই অস্থিরতার মধ্যেই ববি ওয়াইনের কণ্ঠে একটি সহজ দাবি শোনা যায়, তারা শুধু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















