ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভা প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪২ জন। নিখোঁজ দের মধ্যে রয়েছেন দেশটির এলিট মেরিন বাহিনীর ১৯ সদস্য। ভারী বৃষ্টিপাতের পর পাহাড়ি ঢালে ধস নেমে তাদের প্রশিক্ষণ শিবির ও আশপাশের বসতবাড়ি মাটিচাপা পড়ে।
পশ্চিম জাভার বান্দুং জেলার পাসিরলাঙ্গু গ্রামে মাউন্ট বুরাংরাংয়ের ঢালে শনিবার ভোররাতে এই ভূমিধস ঘটে। টানা দুই রাতের প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়ে। হঠাৎ ধসে পড়া মাটি ও কাদার স্রোত গ্রামটির ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে প্রায় ৩৪টি বাড়ি গিলে ফেলে।
মেরিন প্রশিক্ষণে নেমেই বিপর্যয়
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর প্রধান স্টাফ অ্যাডমিরাল মুহাম্মদ আলি জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে চারজন মেরিন সদস্য রয়েছেন। তারা ২৩ সদস্যের একটি দলের অংশ ছিলেন, যারা পাপুয়া নিউগিনি সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের আগে দুর্গম এলাকায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। বাকি মেরিন সদস্যদের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তার ভাষায়, প্রবল বৃষ্টির কারণে প্রশিক্ষণ এলাকা পুরোপুরি মাটিচাপা পড়ে যায়। সরু রাস্তা ও কাদা মাখা অস্থিতিশীল মাটির কারণে ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ভীষণ সমস্যায় পড়ছে।
উদ্ধারকাজে বিপুল জনবল, তবু ঝুঁকি কাটেনি
স্থানীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার দপ্তরের প্রধান আদে দিয়ান পারমানা জানান, এখন পর্যন্ত ৪২ জন নিখোঁজ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। মাটি এখনো পানিতে ভেজা ও নরম থাকায় উদ্ধারকর্মীরা নিরাপদে কতদূর এগোতে পারবেন, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
প্রথমে প্রায় ৫০০ জন নিয়ে শুরু হওয়া উদ্ধার অভিযান এখন বিস্তৃত হয়ে ২ হাজার ১০০ জনে দাঁড়িয়েছে। খালি হাত, পানি নিষ্কাশনের পাম্প, ড্রোন ও খনন যন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তবে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকাজ কে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

স্বজন হারানোর অপেক্ষায় গ্রামবাসী
পাসিরলাঙ্গু ও আশপাশের এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অসহায় মানুষজন ঘটনাস্থলের পাশে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন। শনিবার ভোরে কাদা ও পাথরের স্রোত গ্রামটিতে ঢুকে পড়ার পর বহু পরিবার ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
সায়েপুদ্দিন নামের এক বাসিন্দা জানান, তার বোন সহ পরিবারের ১১ জন সদস্য এখনো নিখোঁজ। প্রতিদিন তিনি খবরের আশায় গ্রামে আসছেন। তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেন, জীবিত থাকার আশা নেই, শুধু দেহগুলো খুঁজে পাওয়াটাই এখন শেষ চাওয়া।
কাদার নিচে চাপা পড়েও বেঁচে ফেরা

আদার নামে ৬৩ বছর বয়সী এক ছাগল খামারি সেই ভয়াল মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, হঠাৎ কাদা আর মাটি এসে তার শোবার ঘর ভরিয়ে দেয়। নাতি নিয়ে তিনি কোমর পর্যন্ত কাদায় চাপা পড়েছিলেন। কোনোমতে দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসে দুজনেই প্রাণে বেঁচে যান। তার বাড়ির সামনে এখনো আধা মাটিচাপা একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বন উজাড় ও পাহাড়ি চাষের দায় চাপছে
স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্যমতে, এই ভূমিধসে ৫০টির বেশি বাড়ি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৬৫০ জনের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
পশ্চিম জাভার গভর্নর দেদি মুলিয়াদি এই বিপর্যয়ের জন্য পাহাড়ি ঢালে বিস্তৃত সবজি চাষকে দায়ী করেছেন। তার মতে, এলাকাটি বনভূমি হওয়া উচিত ছিল। ভূমিধসের ঝুঁকি বেশি থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
![]()
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড় হলে মাটির শিকড়ের বাঁধন দুর্বল হয়ে যায়। ফলে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। গত বছর সুমাত্রায় একই ধরনের দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় বারোশ মানুষ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















