বাংলাদেশে চীনের সহায়তায় ড্রোন বা মানববিহীন আকাশযান উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো কারণ নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও নিজস্ব বিবেচনার ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সহায়তায় কোনো কারখানা স্থাপন করে, তা হবে দেশের স্বার্থেই। এ বিষয়ে কে কী ভাবল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ভারত বা পাকিস্তানে কী হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের কি কোনো গুরুত্ব রয়েছে?
চীনের সঙ্গে সহযোগিতা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের সহযোগিতা আগেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যদি কোনো কারখানা স্থাপন হয়, সেটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি বিষয় নয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া
নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশে আসার আগে ও পরে যে মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তৌহিদ হোসেন বলেন, সরকার বিষয়টি দেখেছে। তবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে এবং সেই পথেই কাজ করবে।
জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গে মন্তব্য এড়িয়ে গেলেন উপদেষ্টা
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী শক্ত অবস্থান নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা দলটির সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহী। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তাঁর মতে, জল্পনা-কল্পনায় লাভ নেই। নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, তারাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে।
ঢাকা–বেইজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে এ চুক্তি হয়।
চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন একটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান, যারা ইলেকট্রনিক্স, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় কাজ করে। চুক্তির আওতায় আধুনিক মানববিহীন আকাশযান উৎপাদন ও সংযোজন কেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্প দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী মধ্যম উচ্চতার কম স্থায়িত্বসম্পন্ন ড্রোন এবং উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণ সক্ষম ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা অর্জন করবে। ভবিষ্যতে নিজস্ব ড্রোন উৎপাদনের পথও খুলবে। এসব ড্রোন সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনা প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
এদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বিস্তৃত প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন বিকল্প দিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশ সরকার যদি চীনের সঙ্গে কিছু খাতে এগোতে চায়, সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে বলেও জানান তিনি।
চীনের কড়া প্রতিক্রিয়া
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের জবাবে চীন কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ঢাকায় চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র বলেছেন, এ ধরনের মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন। এতে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চীনা মুখপাত্র আরও বলেন, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। দুই দেশের সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের উপকারে এসেছে এবং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে সহায়ক। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সহযোগিতা তাদের নিজস্ব বিষয়, এতে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ বা আঙুল তোলার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















