মৃত্যু কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। অনেক সময় সেই সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক হয়ে যায়—এমন কথাই বলছেন নিউইয়র্কের ওয়েবস্টারের বাসিন্দা সুসান রাহন। চুয়ান্ন বছরের এই দাদী দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্তন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সময় বেঁচে থেকেছেন তিনি। ছেলেকে বড় হতে, পড়াশোনা শেষ করতে, পরিবার গড়তে দেখেছেন। নাতনিদের দেখাশোনা করেন নিয়মিত। জন্মদিনে পরিবার নিয়ে ঘুরে এসেছেন বিনোদন পার্ক থেকেও।
শেষ সময়ের প্রস্তুতি ও নিজের মতো বিদায়ের ইচ্ছে
সুসান রাহনের ক্যান্সার এখন হাড় ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছে। কখন মৃত্যু আসবে তিনি জানেন না, তবে জানেন শেষ সময়টা শ্বাসরুদ্ধকর হতে পারে। সেই কারণেই তিনি চান, মৃত্যুর আগে সবাইকে হাসি আর আনন্দের স্মৃতি দিয়ে যেতে। মৃত্যুর দিনটি যেন শোকের নয়, বিদায়ের এক শেষ পার্টি হয়ে ওঠে—এই স্বপ্নই তার।
এই ইচ্ছার পেছনে রয়েছে নিউইয়র্কে আসন্ন চিকিৎসা সহায়তায় মৃত্যু আইন। গভর্নর ক্যাথি হোকুল শিগগিরই এই আইনে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। আইন কার্যকর হলে ছয় মাসের কম সময় বাঁচার সম্ভাবনা থাকা রোগীরা আইনগতভাবে প্রাণঘাতী ওষুধ নিতে পারবেন এবং নিজেরাই তা গ্রহণ করবেন। তবে আইন কার্যকরে ছয় মাসের বিলম্ব এবং বাড়তি শর্ত থাকায় সুসান রাহনের আশঙ্কা, তার অসুস্থতা দ্রুত খারাপ হলে হয়তো এই সুযোগ তিনি পাবেন না।
কোন পথে হাঁটছে নিউইয়র্ক
এই আইন পাস হলে নিউইয়র্ক হবে যুক্তরাষ্ট্রের ত্রয়োদশ রাজ্য, যেখানে এমন ব্যবস্থা বৈধ। প্রথম এই ধরনের আইন চালু হয় ওরেগনে, উনিশ শো চুরানব্বই সালে। এখন পর্যন্ত যেসব রাজ্যে এই আইন আছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ডেমোক্র্যাট ঘরানার।
আইনের সমর্থকদের মতে, অসহনীয় যন্ত্রণা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন নিজের শর্তে মৃত্যুবরণ করার অধিকার থাকা উচিত। নিউইয়র্কের আইনপ্রণেতা অ্যামি পলিন দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে এই আইনের জন্য লড়াই করেছেন। তার মতে, রোগীরা জানেন তারা মৃত্যুপথযাত্রী, কিন্তু অন্তত শেষ মুহূর্তের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তিটুকু চান।
আপত্তি ও ভয়ের জায়গা
তবে বিরোধিতাও প্রবল। প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী ড্যানিস ম্যাকমালিন-পাওয়েল এই আইনের ঘোর বিরোধী। তার আশঙ্কা, এই ধরনের আইন ধীরে ধীরে দুর্বল ও প্রতিবন্ধী মানুষের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তার মতে, তথাকথিত সুরক্ষা ব্যবস্থা মূলত ওষুধ প্রদানকারী ও সিদ্ধান্তদাতাদের রক্ষা করে, রোগীদের নয়। অনেক সময় প্রতিবন্ধী মানুষকে ভুলভাবে মৃত্যুপথযাত্রী ধরে নেওয়া হয়—এই অভিযোগ ও তুলেছেন তিনি।
বিরোধীদের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় সংগঠন ও রক্ষণশীল গোষ্ঠী। ক্যাথলিক চার্চ একে মানবজীবনের পবিত্রতার বিরুদ্ধে বলে মনে করে। নিউইয়র্কের ক্যাথলিক বিশপরা এই আইনকে ‘মৃত্যুর সংস্কৃতি’ প্রচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের মতে, জীবন দেওয়ার অধিকার ঈশ্বরের, নেওয়ার অধিকার ও একমাত্র তারই।
আইন কী অনুমতি দেয়
এই আইনে রোগীকে ছয় মাসের কম সময় বাঁচার সম্ভাবনা থাকতে হবে এবং মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। ওষুধ রোগী নিজেই গ্রহণ করবেন। চিকিৎসকেরা যোগ্যতা নির্ধারণ করবেন এবং নির্দিষ্ট অপেক্ষাকাল ও মানসিক মূল্যায়নের নিয়ম মানতে হবে। প্রতি বছর মৃত্যুর তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও রয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে খুব অল্প মানুষই এই ওষুধ ব্যবহার করেন। যেসব রাজ্যে আইনটি চালু, সেখানে মোট মৃত্যুর এক শতাংশেরও কম এই প্রক্রিয়ায় ঘটে। অনেকেই ওষুধ সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যবহার করেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পথ বেছে নেওয়া মানুষদের বড় অংশই ক্যানসারে আক্রান্ত ও তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত ও স্বচ্ছল।
জনমত বদলের গল্প
যুক্তরাষ্ট্রে জনমত ধীরে ধীরে এই আইনের পক্ষে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ চিকিৎসা সহায়তায় মৃত্যুর পক্ষে। নিউইয়র্কে করা এক সমীক্ষায় ও বেশিরভাগ ভোটার এই আইন সমর্থন করেছেন। যদিও ধর্মীয় ও রক্ষণশীল অংশ এখনো দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে যাচ্ছে।
গভর্নর ক্যাথি হোকুল নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। মায়ের অসুস্থতায় যন্ত্রণা দেখার অভিজ্ঞতা তাকে সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করেছে বলে তিনি জানান। শেষ পর্যন্ত বাড়তি নিয়ম যুক্ত করে আইনটিতে সম্মতি দেন তিনি।

নিজের বিশ্বাস আর নিজের সিদ্ধান্ত
সুসান রাহন নিজেও ক্যাথলিক। তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ নন, বাঁচতে চান। কিন্তু জানেন, ক্যানসারেই তার মৃত্যু হবে। দীর্ঘ যন্ত্রণা তিনি চান না। তার বিশ্বাস, ঈশ্বর করুণাময়, তিনি মানুষের কষ্ট দেখতে চান না।
শেষ বিদায়ের পার্টির জন্য গান ঠিক করা আছে, পাশে থাকবে তার পোষা কুকুর। প্রিয়জনদের বিদায় জানিয়ে তিনি শান্ত ঘুমে চলে যেতে চান। তার কাছে এটি মৃত্যুকে বেছে নেওয়া নয়, বরং শেষ মুহূর্তটুকু নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















