নাতি-নাতনির দেখভালে সহায়তা আশীর্বাদ হতে পারে। কিন্তু সেই সহায়তাই যখন নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয়, তখন পরিবারে তৈরি হয় অস্বস্তি ও দ্বন্দ্ব। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পরিবারেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক নতুন বাস্তবতা—হেলিকপ্টার দাদু-দিদা। যারা সন্তান বড় করার সময় যেমন অতিরিক্ত নজরদারি করতেন, এখন নাতি-নাতনির ক্ষেত্রেও একই অভ্যাস ধরে রেখেছেন।
পারিবারিক টানাপোড়েনের নতুন চিত্র
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসা এক ভিডিওতে এক মা মজা করে নিজের মাকে বলেন, নাতিদের মা তিনি নিজেই, আর দাদির ভূমিকা আলাদা। কথাটি রসিকতা হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু পরিবারের চাপা উত্তেজনা। সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্তে দাদু-দিদার অতিরিক্ত মতামত, নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া কিংবা অভিভাবকদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা অনেক বাবা-মাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।
অভিভাবক পরামর্শক এমিলি গ্রিনবার্গের মতে, পরিবারের সহায়তা পাওয়া নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের। কিন্তু সেই সহায়তা যদি সীমা ছাড়ায়, তাহলে তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তার ভাষায়, সহযোগিতা স্বস্তি দেয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ক্লান্ত করে। তিনি বলেন, অনেক দাদু-দিদা নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ থেকে এমন আচরণ করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারে নিজের গুরুত্ব হারানোর ভয় থেকেই এই অতিরিক্ত জড়িত থাকার প্রবণতা তৈরি হয়।
ভূমিকা ভুলে গেলে বাড়ে দূরত্ব
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ট এলার মতে, দাদু-দিদার সঙ্গে নাতি-নাতনির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিবারের জন্য ইতিবাচক। এতে বাবা-মায়ের চাপ কমে, আর বয়স্কদের জীবনে আসে নতুন অর্থ ও উদ্দীপনা। তবে সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন দাদু-দিদারা ভুলে যান যে বাবা-মায়ের নিজস্ব এক অভিভাবক জগৎ রয়েছে, যেটিকে সম্মান করা জরুরি।
শিশু মনোবিজ্ঞানী ডেল অ্যাটকিন্স বলেন, দাদু-দিদার দায়িত্ব হলো কৌতূহলী হওয়া, সমালোচনামুখর নয়। কী বলা হচ্ছে, কীভাবে বলা হচ্ছে এবং কোন সীমার মধ্যে বলা হচ্ছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। কারণ নাতি-নাতনি তাদের সন্তান নয়।
অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
এমিলি গ্রিনবার্গ নিজের পরিবারে দাদু হিসেবে বাবার পরিবর্তন দেখেছেন। নাতির সঙ্গে খেলাধুলা, সময় কাটানো তার বাবার জীবনে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে। তিনি বলেন, নাতি তার বাবার মধ্যে নতুন শক্তি, উষ্ণতা ও সৃজনশীলতা এনে দিয়েছে। এই সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় দাদু-দিদারা নিজের আগের অভিভাবকত্বের ভুলগুলো সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নাতি-নাতনির জীবনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু দাদু-দিদা হওয়া মানে দ্বিতীয়বার বাবা-মা হওয়ার সুযোগ নয়। প্রত্যাশা স্পষ্ট না হলে সেখান থেকেই জন্ম নেয় ভুল বোঝাবুঝি।
সীমা নির্ধারণই সমাধান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারের এই টানাপোড়েন এড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। নিয়মিত খোলামেলা আলোচনা, অনুভূতির স্বীকৃতি এবং স্পষ্ট সীমা নির্ধারণই পারে সম্পর্ক সুস্থ রাখতে। বাবা-মায়েরা প্রয়োজনে জানাতে পারেন, কোন বিষয়ে মতামত প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে দাদু-দিদাদের উদ্বেগ ও ভালোবাসাকেও সম্মান দেখানো জরুরি।
সবার ভূমিকাই আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—শিশুর সুস্থ ও সুখী বেড়ে ওঠা। এই সত্যটা সবাই মেনে নিতে পারলেই হেলিকপ্টার দাদু-দিদা আর পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণ হবে না, বরং সম্পর্ক হয়ে উঠবে আরও দৃঢ়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















