বারো বছর আগে আজকের দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত হারিয়েছিল এক অনন্য ব্যক্তিত্বকে। রাষ্ট্রনির্মাতা, নীতিনির্ধারক ও সংবাদমাধ্যমের পথিকৃৎ ড. আবদুল্লাহ ওমরান তারিয়াম ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। সময় গড়িয়ে গেলেও তাঁর চিন্তা, কাজ ও আদর্শ আজও সমানভাবে জীবন্ত, সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সহকর্মী, শিক্ষার্থী, বন্ধু এবং যাঁদের জীবনে তিনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব রেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে ড. আবদুল্লাহ ওমরান এক মানবিক ও দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবে স্থায়ী হয়ে আছেন। সদাচরণ, দূরদর্শী পরামর্শ, সাহসী মতামত এবং দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রাষ্ট্র নির্মাণে ভূমিকা ও নেতৃত্ব
ড. আবদুল্লাহ ওমরানের জীবনপথ সহজ ছিল না। শুরু থেকেই তাঁকে সংগ্রাম ও প্রতিবন্ধকতার মুখে দাঁড়িয়ে এগোতে হয়েছে। তবে দৃঢ় মনোবল ও অবিচল সংকল্পের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের সময় তিনি তাঁর ভাই তারিয়াম ওমরানের সঙ্গে আলোচক দলের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নয় সদস্য ও সাত সদস্যের আলোচক দলের মাধ্যমে তিনি ঐক্য ও রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথম ফেডারেল সরকারে তিনি ন্যায়বিচার মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। আবার নব্বইয়ের দশকে ফিরে আসেন ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে। প্রতিটি দায়িত্বেই তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বাধীন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা।
ন্যায়বিচার ও সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকার
ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ড. আবদুল্লাহ ওমরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তিনি আইন প্রণয়ন ও সংস্কারে সক্রিয় ছিলেন। আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন এবং স্থানীয় বিচারক ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে আইনকে সময়োপযোগী করেন।
আশির দশকে আল খালিজ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ন্যায়বিচারই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। সংবিধানের ধারাগুলোর আলোকে তিনি ফেডারেল বিচার ব্যবস্থাকে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন, যা রাষ্ট্রীয় ঐক্যকে আরও সুসংহত করে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন
১৯৭২ সালে শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. আবদুল্লাহ ওমরান আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলেন। পাঠ্যক্রমে আধুনিক চিন্তা ও জাতীয় ইতিহাসের সমন্বয় ঘটান। প্রতিষ্ঠাতাদের ইতিহাস ও আমিরাতের ঐতিহ্য শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় পরিচয়ের বোধ জাগ্রত করেন।
নিরক্ষরতা দূরীকরণ, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা বিস্তার এবং অতিরিক্ত কোচিং নির্ভরতা কমানো ছিল তাঁর অগ্রাধিকার। তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সংবাদমাধ্যমে পথিকৃতের ভূমিকা
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আগেই ড. আবদুল্লাহ ওমরান সংবাদ মাধ্যমে নিজের ছাপ রাখেন। ভাই তারিয়াম ওমরানের সঙ্গে ১৯৭০ সালে তিনি আল খালিজ পত্রিকার যাত্রা শুরু করেন। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ও নানা ঝুঁকি সত্ত্বেও তাঁদের অদম্য সাহস এই উদ্যোগকে সফল করে তোলে। রাজনৈতিক সচেতনতা ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে আল খালিজ দ্রুতই একটি প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে এই পত্রিকাই আরব বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। সাংস্কৃতিক সংযোজন ও বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতায় তারিয়াম ওমরান ও ড. আবদুল্লাহ ওমরানের অবদান আজও স্মরণীয়।

সম্মান ও স্মৃতির স্থায়িত্ব
ড. আবদুল্লাহ ওমরান তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নানা সম্মানে ভূষিত হন। তাঁকে স্মরণ করে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সাহিত্যিক মিলনায়তনের নামকরণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ তাঁর অবদানকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে রেখেছে।
ড. আবদুল্লাহ ওমরান তারিয়ামের জীবন কেবল একজন মানুষের গল্প নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের বিকাশ, একটি সমাজের আত্মপরিচয় এবং একটি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার ইতিহাস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















