শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে ভয়াবহ আশঙ্কার ছবি আঁকা হয়েছিল, বাস্তবতা নাকি তার সম্পূর্ণ উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার আরোপিত শুল্কই আমেরিকান অর্থনীতিকে আবার বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। বাজার ধস, মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে বলেই তার বক্তব্য।
শুল্ক আরোপের পর অর্থনীতির চিত্র
গত বছরের এপ্রিলে প্রায় সব বিদেশি দেশের পণ্যে ঐতিহাসিক শুল্ক আরোপের সময় সমালোচকেরা বলেছিলেন, এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। ট্রাম্পের ভাষায়, বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অর্থনৈতিক বিস্ময়। শেয়ারবাজারে একের পর এক রেকর্ড, মূল্যস্ফীতি প্রায় নেই বললেই চলে, আর প্রবৃদ্ধি চলছে দ্রুত গতিতে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে একান্নর বেশি সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তার দাবি, প্রায় শূন্য মূল্যস্ফীতির মধ্যেই এই উত্থান ঘটেছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
বাইডেন আমলের উত্তরাধিকার ও পরিবর্তনের দাবি
ট্রাম্প বলেছেন, আগের প্রশাসনের সময় লাগামছাড়া ব্যয় ও চরম পরিবেশ নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে কঠিন মূল্যস্ফীতির মুখে ঠেলে দেয়। সাধারণ পরিবারের প্রকৃত আয়ে বড় ধাক্কা লাগে। সেই সময়কে তিনি স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির যুগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার মতে, দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মূল্যস্ফীতি নেমেছে অস্বাভাবিকভাবে নিচে, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পৌঁছেছে বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার চার শতাংশের বেশি, আর পরের প্রান্তিকে তা আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস।
আয় বৃদ্ধি ও বাজারের উত্থান
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, গত বছরে সাধারণ কর্মীদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তা ভোগ্যপণ্যের দামের চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। শুল্ক আরোপের পর শেয়ারবাজারে যে উত্থান দেখা গেছে, তাতে শিল্প সূচক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ও তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি ও বাণিজ্য ঘাটতি ছিল নজিরবিহীন। শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে এক বছরের মধ্যেই ফেডারেল ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং মাসিক বাণিজ্য ঘাটতিও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বেড়েছে, ইস্পাত উৎপাদন ও কারখানা নির্মাণে গতি এসেছে।
শুল্কের বোঝা কার কাঁধে
শুল্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, এর চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপর। ট্রাম্প বলছেন, তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শুল্কের বড় অংশ বহন করছে বিদেশি উৎপাদক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। রপ্তানি নির্ভর দেশগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই শুল্ক নিজ কাঁধে নিতে হয়েছে, যাতে তাদের বাজার হারাতে না হয়।
বিনিয়োগ ও শিল্পে পুনর্জাগরণ
শুল্ককে হাতিয়ার করে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ টানার কথা ও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তার দাবি, এক বছরের কম সময়ে বহু ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। গাড়ি শিল্প থেকে শুরু করে আধুনিক চিপ ও ওষুধ উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নতুন কারখানা গড়ে উঠছে।
তার মতে, ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ ও শুল্কের চাপ ছাড়া সম্ভব হতো না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাজার বাড়ছে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নতুন রূপ নিচ্ছে।
বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনীতি
ট্রাম্প দাবি করেন, শুল্ক কেবল অর্থনীতিই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা কে শক্তিশালী করেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সমঝোতার মাধ্যমে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। তার বক্তব্যে, এসব উদ্যোগ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে।
শেষ পর্যন্ত তার স্পষ্ট দাবি, শুল্কই আমেরিকাকে আবার শক্তিশালী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করেছে। সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা, গত এক বছরের ফলাফল দেখেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















