বিশ্ব রাজনীতির কৌশলগত সংকটে অপ্রত্যাশিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। বাহিয়া রাজ্যের একটি গবেষণা পার্কের ভেতরে গোলাপি রঙের এক গুদামঘর ঘিরে তৈরি হচ্ছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার নতুন আশা। এখানেই লাতিন আমেরিকার প্রথম দিকের বিরল পৃথিবী খনিজ পৃথকীকরণ কারখানা গড়ে তুলছে একটি দেশীয় খনন প্রতিষ্ঠান। ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে গৃহস্থালি যন্ত্র পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য এই সতেরোটি খনিজ উপাদান নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন।
চীনের দখল আর পশ্চিমা উদ্বেগ
বর্তমানে বিরল পৃথিবী খনিজ উত্তোলনের বড় অংশ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় পুরোটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু কারখানায় উৎপাদন কমাতে হয়েছে। বিশেষ করে যানবাহন, সবুজ প্রযুক্তি আর অস্ত্র শিল্পে ব্যবহৃত শক্তিশালী চুম্বকের ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে। সাময়িক সমঝোতা হলেও শিল্পমহল আশ্বস্ত নয়। বিকল্প উৎস খোঁজার তাগিদে নজর পড়েছে ব্রাজিলের দিকে।
ব্রাজিলের ভূগর্ভে লুকানো সম্ভাবনা
বিশ্বের পরিচিত বিরল পৃথিবীর খনিজ ভাণ্ডারের প্রায় এক চতুর্থাংশ রয়েছে ব্রাজিলে, যা চীনের পরেই দ্বিতীয়। শক্তিশালী খনি শিল্প, সস্তা বিদ্যুৎ, খনিজ রপ্তানির অভিজ্ঞতা আর দক্ষ প্রকৌশলী এই দেশকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। অতীতে পঞ্চাশের দশকে এক সময় বিশ্বের শীর্ষ বিরল খনিজ উৎপাদক ও ছিল ব্রাজিল। পরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আর রাষ্ট্রায়নের ফলে সেই অবস্থান হারায় দেশটি।
সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা
বর্তমান সরকার এই খাতে নতুন করে নেতৃত্ব ফেরাতে চাইছে। প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে বিরল খনিজকে যুক্ত করে বিশেষ অর্থায়ন, সরকারি ক্রয় সুবিধা আর আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। লক্ষ্য শুধু রপ্তানি আয় নয়, বরং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে দেশীয় উদ্ভাবন জোরদার করা।

কূটনীতি আর বাণিজ্যের সমীকরণ
বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ গুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ঘাটতিতে ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও বিরল খনিজ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ না দেখালে ইউরোপ, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর চাহিদা ও রয়েছে। এই বাস্তবতা ব্রাজিলকে কূটনৈতিক দরকষাকষিতে শক্ত অবস্থান দিচ্ছে।
পথে থাকা বাধা আর বাস্তবতা
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বর্তমানে কার্যকর একটি মাত্র খনি রয়েছে, যেখানে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিয়েছে। বহু নতুন প্রকল্প লাইসেন্সের অপেক্ষায়, যেগুলোর উৎপাদনে আসতে সময় লাগবে আরও কয়েক বছর। দেশেই প্রক্রিয়াজাতকরণে অনাগ্রহ, পুঁজি ঘাটতি আর দক্ষতার অভাব বড় সমস্যা। তবু আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আসতে শুরু করেছে, যা এই খাতকে ধীরে হলেও এগিয়ে নেবে।
বৈশ্বিক বাজারের নতুন হিসাব
চীনের দীর্ঘদিনের কমদাম কৌশল ভেঙে নতুন মূল্য কাঠামো তৈরি হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নতুন বিনিয়োগকারীদের টানছে। শেষ পর্যন্ত বাজারে একীকরণ ঘটলেও যেসব দেশের মাটিতে এই সম্পদ রয়েছে, তাদের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















