ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষের মৃত্যুর পর তেহরানের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে জোরালো আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প এমন বিকল্প বিবেচনা করছেন, যেখানে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রভাবশালী নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সীমিত হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের সাহস জোগানোর চিন্তাও রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি ও আরব কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, কেবল আকাশপথের শক্তি প্রয়োগে ইরানের ধর্মীয় শাসন ভেঙে পড়বে না।
শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য ঘিরে আলোচনা
ওয়াশিংটনের আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই মার্কিন সূত্র জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরুতে রক্তক্ষয়ী দমন অভিযানে দেশজুড়ে আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প শাসন পরিবর্তনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির কথা ভাবছেন। সেই লক্ষ্যেই সহিংসতার জন্য দায়ী বলে যুক্তরাষ্ট্র যে সব কমান্ডার ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে, তাদের ওপর আঘাত হানার পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে আন্দোলনকারীরা সরকারি ও নিরাপত্তা স্থাপনায় চাপ বাড়াতে আত্মবিশ্বাস পেতে পারেন। তবে সামরিক পথে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প।

বড় হামলার বিকল্প ও সামরিক প্রস্তুতি
আলোচনায় থাকা আরেকটি বিকল্প হলো আরও বড় পরিসরের আঘাত, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নাগালে থাকা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কিংবা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি লক্ষ্য করা। ইরান এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজের একমাত্র প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে দেখে এবং এ নিয়ে কোনো সীমাবদ্ধতায় রাজি নয় বলে সূত্র জানিয়েছে। এ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী ও সহায়ক যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানোয় সামরিক পদক্ষেপের সক্ষমতাও বেড়েছে।
আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ
ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি ইরানের শাসন উৎখাত হয়, তবে শুধু বিমান হামলায় তা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, মাটিতে সেনা উপস্থিতি ছাড়া শাসন উল্টে দেওয়া যায় না। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেও নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে। তাঁর মতে, বহিরাগত চাপের সঙ্গে সংগঠিত অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তির সমন্বয় না হলে রাজনৈতিক গতিপথ বদলানো কঠিন।

ইরানের অবস্থান ও কূটনৈতিক বার্তা
তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখতে চাইছে। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক এবং পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে আলোচনায় বসতে তারা প্রস্তুত। তবে চাপ প্রয়োগ করা হলে নজিরবিহীনভাবে আত্মরক্ষা করা হবে বলেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
উত্তরাধিকার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা
ছিয়াশি বছর বয়সী খামেনি সাম্প্রতিক সময়ে দৈনন্দিন শাসন থেকে অনেকটাই সরে গেছেন এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বাস্তব ক্ষমতার বড় অংশ এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের হাতে। তবু যুদ্ধ, উত্তরাধিকার ও পারমাণবিক কৌশল নিয়ে শেষ কথা এখনো খামেনিরই। তাঁর পর কে নেতৃত্ব দেবেন, তা স্পষ্ট নয়। এই শূন্যতায় বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কর্তৃত্ব আরও শক্ত হতে পারে বলে আরব ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের আশঙ্কা।

আঞ্চলিক ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রভাব
উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হানলে প্রথম প্রতিশোধের লক্ষ্য তারাই হতে পারে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীসহ তেহরান-ঘনিষ্ঠ শক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মিসর ওয়াশিংটনকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের ভয়, নব্বই মিলিয়ন মানুষের দেশ ইরান ভেঙে পড়লে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে, শরণার্থী স্রোত বাড়বে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো ধীরে ধীরে ক্ষয়, যেখানে অভিজাত পর্যায়ের ভাঙন, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থা শাসনব্যবস্থাকে চাপে ফেলবে। এর পরিণতি শুধু ইরান নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা বয়ে আনতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















