ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে জন্মান্ধ হয়েও ভিক্ষা না করে সম্মানের জীবন গড়ে তুলেছিলেন আবদুল গফুর মল্লিক। দারিদ্র্য আর অক্ষমতাকে সঙ্গী করেও নিজের শ্রমে জীবন চালিয়ে যাওয়া এই মানুষটির শান্ত দিনযাপন শুক্রবার রাতে এক ঝটকায় ভেঙে পড়ে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার খোলাবাড়ীয়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা ও লুটপাটে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।
গভীর রাতে হামলা ও লুটপাট
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত আবদুল গফুর মল্লিকের বাড়িতে হামলা চালায়। টিনের বেড়া ভেঙে বাড়িতে ঢুকে নগদ অর্থ লুট করা হয়। শুধু এই বাড়িতেই নয়, পাশের আরও কয়েকটি বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কে রাত কাটান গ্রামবাসী।

থানায় অভিযোগ ও গ্রেপ্তার
ঘটনার পর আবদুল গফুরের দত্তক পুত্র আবদুল বাতেন মল্লিক রাজবাড়ী সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এক নারীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।
ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে হামলার অভিযোগ
আবদুল বাতেন মল্লিকের দাবি, স্থানীয় একটি বেকারি ব্যবসা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধের জের ধরে এই হামলা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের বাড়িসহ তিনটি বাড়ির বেড়া ও আসবাব ভাঙচুর করা হয় এবং এক লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ ও মালামাল লুট হয়।
কাঁপা কণ্ঠে ন্যায়বিচারের আবেদন
ঘটনার পর কাঁপা কণ্ঠে আবদুল গফুর মল্লিক বলেন, কেন তাঁর বাড়িতে হামলা হলো তা তিনি বুঝতে পারছেন না। জন্মান্ধ হওয়ায় কী পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে তাও তাঁর জানা নেই। সব জানেন তাঁর ছেলে। তিনি শুধু ন্যায়বিচার চান এবং নিজের ছোট্ট ঘরে আবার শান্তি ফিরে আসুক—এই আশাই তাঁর।
সংগ্রামের জীবন আর নতুন শঙ্কা
পঁচাত্তর বছর বয়সী আবদুল গফুর জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। কৈশোরে তাঁকে ভিক্ষায় নামতে বলা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বাড়ি বাড়ি বাদাম ও বীজ বিক্রি করে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে জীবন চালিয়ে গেছেন। এই আত্মসম্মান আর সংগ্রামের গল্প একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর্থিক সহায়তা ও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজ সেই সংগ্রামী মানুষটিকেই আবার লড়তে হচ্ছে ভয় আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে।
এই হামলার পর এলাকাবাসীর প্রশ্ন একটাই—অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে সম্মানের জীবন গড়া এই মানুষটির আস্থাই যে চিরতরে ভেঙে পড়বে, সেই আশঙ্কাই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজবাড়ীর খোলাবাড়িয়া গ্রামে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















