আমরা প্রতিদিন কী খাই, তা শুধু স্বাদ বা অভ্যাসের বিষয় নয়, দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এই খাদ্যাভ্যাসই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে বা কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। কয়েক দশকের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, কোনো একক খাবার বা তথাকথিত বিশেষ খাদ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই শরীরকে ক্যানসারের দিকে ঠেলে দেয় কিংবা সুরক্ষা দেয়। তবে কোনো ব্যক্তির ক্যানসার ধরা পড়ার পেছনে শুধু খাবারই দায়ী, এমনটি নয়। জীবনযাপন, জিনগত কারণ, পরিবেশসহ নানা বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। তবু জনস্বাস্থ্য পর্যায়ে কিছু সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে, যেগুলো জানা জরুরি।

উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের গুরুত্ব
যেসব খাদ্যাভ্যাসে পূর্ণ শস্য, তাজা ফল ও শাকসবজি এবং উদ্ভিদভিত্তিক বা হালকা প্রোটিনের প্রাধান্য থাকে, সেগুলোর সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া গেছে। এমন খাবার শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা ও প্রদাহ কম রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন ইনসুলিন বেশি থাকা ও প্রদাহ চলতে থাকলে অপ্রয়োজনীয় কোষ বিভাজন বাড়ে, ডিএনএ ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয় এবং কোষের স্বাভাবিক মৃত্যু বাধাগ্রস্ত হয়, যা ক্যানসারের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। পূর্ণ শস্য, ফল, শাকসবজি, ডাল ও বাদামে থাকা আঁশ হজমতন্ত্রে ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শ কমায় এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুকে শক্তিশালী করে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। সবুজ পাতাযুক্ত শাক ও গাঢ় হলুদ রঙের সবজি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হলে এই সুফল আরও স্পষ্ট হয়।

মাংস বাছাইয়ে সতর্কতা
প্রক্রিয়াজাত মাংস মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, আর লাল মাংসকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। লাল মাংসে থাকা এক ধরনের লোহা এবং উচ্চ তাপে রান্নার সময় তৈরি হওয়া কিছু রাসায়নিক ডিএনএ ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহৃত সংরক্ষণকারী উপাদানও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলা এবং লাল মাংস সপ্তাহে সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উচ্চ তাপে ঝলসানো বা ধোঁয়ায় রান্নার বদলে বিকল্প পদ্ধতি বেছে নেওয়া ঝুঁকি কমাতে পারে। মাছের মতো বিকল্প খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
চিনি মেশানো পানীয়সহ অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণ বাড়ছে। এসব খাবারে চিনি ও ক্যালরি বেশি থাকায় স্থূলতা ও ইনসুলিন প্রতিরোধ তৈরি হয়। পাশাপাশি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাবারের রাসায়নিক উপাদান অন্ত্রের ভালো ও খারাপ জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে এবং অন্ত্রের দেয়ালে ক্ষতি করে প্রদাহ বাড়ায়। সাম্প্রতিক এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সাধারণ সংরক্ষণকারী উপাদান সামগ্রিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে স্তন ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ক্ষেত্রে। তাই তাজা, সম্পূর্ণ বা হিমায়িত প্রাকৃতিক খাবার বেছে নেওয়া ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উপায়।

মদ্যপান যত কম, তত ভালো
অতিরিক্ত মদ্যপানে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও অল্প পরিমাণেও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিরাপদ মাত্রা বলে কিছু নেই। শরীরে মদ ভাঙার সময় যে বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়, তা কোষের ক্ষতি করে। মদ শরীরে ইস্ট্রোজেন বাড়ায়, যা কিছু স্তন ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি এটি অক্সিডেটিভ চাপ তৈরি করে ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। যারা পান করেন, খালি পেটে না খাওয়াই ভালো, কারণ খাবার ছাড়া পান করলে ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শ বাড়তে পারে।
কফি, চা ও দুগ্ধজাত খাবারের ভূমিকা
দিনে সীমিত পরিমাণে কফি বা চা পান করলে ইনসুলিন প্রতিরোধ ও প্রদাহ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এসব পানীয়ে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান কোষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, তবে অতিরিক্ত চিনি যোগ না করাই গুরুত্বপূর্ণ। দুগ্ধজাত খাবার ও তাতে থাকা ক্যালসিয়াম অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে টক দইয়ের মতো গাঁজানো দুগ্ধজাত খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্থূলতার ঝুঁকি জানা জরুরি
খাবার ও ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট সম্পর্কটি তৈরি হয় স্থূলতার মাধ্যমে। প্রমাণ বলছে, স্থূলতা একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি ইস্ট্রোজেন বাড়ায় এবং পেটের ভেতরের চর্বি প্রদাহ ও ইনসুলিন প্রতিরোধ জোরদার করে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। সুস্থ ওজন বজায় রাখা ও সক্রিয় জীবনযাপন কেবল ক্যানসার নয়, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















