০৭:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদে ঢাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল দুর্নীতির অভিযোগে ডিএনসিসি প্রশাসক আজাজের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ঢাকায় ভোটার স্থানান্তর নিয়ে তীব্র অভিযোগ বিএনপির, নির্বাচন কমিশনের কাছে কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য দাবি ঢাকায় নটরডেমিয়ানদের ব্যাডমিন্টন উৎসব, মিলনমেলায় চ্যাম্পিয়ন আবু নাদের–মামুন টানা সাত দিন গ্যাসহীন জীবন, শনি আখড়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধে চরম ভোগান্তি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আশ্চর্যজনক উপকারিতা শরিয়াহ মোতাবেক নগরকান্দা-সালথা চলবে, ইসলাম বিক্রির অভিযোগে কড়া বার্তা শামা ওবায়েদের দিনাজপুরে নির্বাচনী উত্তাপ, বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুরের অভিযোগ জন্মান্ধ মানুষের জীবনে হামলা, রাজবাড়ীতে লুটপাটে ভেঙে পড়ল শান্ত জীবনের ভরসা মায়ের টাকা না পেয়ে নৃশংস খুন, রাজশাহীতে মাদকাসক্ত ছেলের গ্রেপ্তার

এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আশ্চর্যজনক উপকারিতা

  • Sarakhon Report
  • ০৫:২৭:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 16

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ অসুবিধাজনক মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা সময়ের জন্য ‌এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকায় নিজেকে অভ্যস্ত করাতে পারলে তা শরীরকে শক্তিশালী করে, স্মৃতিশক্তি উন্নত করে এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে।

আপনি যদি ফ্লামিঙ্গো (লম্বা পায়ের এক ধরনের পাখি) না হয়ে থাকেন, তবে এক পায়ে নাজুকভাবে দাঁড়িয়ে সময় কাটানোয় নিশ্চয়ই আপনি অভ্যস্ত নন। কাজেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই কাজ অবিশ্বাস্যরকমের কঠিন মনে হতে পারে আপনার কাছে।

যখন আমরা ছোট থাকি তখন এক পায়ে দাঁড়ানো নিয়ে খুব একটা চিন্তা আমাদের করতে হয় না। নয় থেকে ১০ বছর বয়সের মধ্যেই আমরা এভাবে দাঁড়ানো ভালোভাবে শিখে ফেলি। ৩০-এর কোঠার শেষ দিকে এক পায়ে দাঁড়ানোয় আমরা সর্বোচ্চ পারদর্শী হই এবং এরপর এই সক্ষমতা আবার কমতে শুরু করে।

কারো বয়স যদি ৫০ বছরের বেশি হয় এবং তিনি যদি এক পায়ে কয়েক সেকেন্ডের বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তবে সেটি তার সার্বিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং কতটা ভালোভাবে তিনি বার্ধক্যকে আলিঙ্গন করছেন সেটির ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু টলোমলো এক পায়ে আপনিই বা কেন দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে চাইবেন– এর পক্ষে বেশ কিছু ইতিবাচক কারণ রয়েছে। এটি আসলে শরীর ও মস্তিষ্কে বেশ কিছু উপকার বয়ে আনে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- পরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে, শারীরিক শক্তি বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে সহজ এই ব্যায়াম শরীরের ওপর বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

আমেরিকান একাডেমি অব ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের পুনর্বাসন চিকিৎসা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, “আপনার যদি মনে হয় এটি (এক পায়ে দাঁড়ানো) সহজ নয়, তবে ভারসাম্যের প্রশিক্ষণ শুরু করার সময় এখনই”।

(দৈনন্দিন জীবনে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রশিক্ষণ কীভাবে যুক্ত করবেন, তা এই আর্টিকেলের পরবর্তী অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।)

বাদামী প্যান্ট ও ধুসর টিশার্ট পরা কাঁধ পর্যন্ত সোনালী চুলের একজন নারী এক পা তুলে একটি ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। একপাশে একটি সোফা ও টবে লাগানো একটি গাছ। অন্যপাশে একটি ডায়নিং টেবিল ও তিনটি চেয়ার। টেবিলের ওপরে কাঁচের বোতলে ফুল, পাশে একটি ছোটো টবে একটি চারা। ঘরের কাচের বেড়ার অন্য পাশে একটি বারান্দা ও গাছপালা দেখা যাচ্ছে
বেশ কিছুটা সময় ধরে এক পায়ে দাঁড়ানোয় নিজেদের অভ্যস্ত করতে পারলে তা শরীরে বেশ কিছু উপকার বয়ে আনে

শরীরের ভারসাম্য নিয়ে কেন চিন্তা করতে হয়?

স্বাস্থ্যগত অবস্থা বুঝতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারাকে চিকিৎসকদের বিবেচনায় নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, বয়স বাড়ার সাথে সাথে পেশিক্ষয় বা সারকোপেনিয়ার যোগসূত্র। (গ্রিক শব্দ ‘সারকো’ অর্থ মাংসপেশি ও ‘পেনিয়া’ মানে অভাব বা ঘাটতি থেকে এই নাম এসেছে।)

৩০ বছরের পর মাংসপেশীর ভর (শরীরে যতটুকু মাংসপশেী আছে) প্রতি ১০ বছরে আট শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮০-তে পৌঁছানো প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের ক্লিনিক্যাল সারকোপেনিয়া দেখা দেয়।

এর সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস- এ সব কিছুর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্ত এটি যেহেতু বিভিন্ন ধরনের মাংসপেশীর ওপর প্রভাব ফেলে, কাজেই তা এক পায়ে দাঁড়াবার সক্ষমতা দিয়ে বোঝা যায়।

যারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার চর্চা করেন তাদের জীবনের পরবর্তী দশকগুলোয় সারকোপেনিয়া দেখা দেওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। কারণ সহজ ব্যায়ামটি পা ও নিতম্বের মাংসপেশীকে উন্নত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রোচেস্টারের মায়ো ক্লিনিকের মোশন অ্যানালাইসিস ল্যাবরেটরির পরিচালক কেন্টন কাউফম্যান বলেন, ” (বয়স বাড়ার সাথে সাথে) এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। ৫০ বা ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা যখন এটি (এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা কমা) প্রথম বুঝতে পারেন, এরপর তাদের জীবনের পরবর্তী দশকগুলোয় সেটি বেশ দ্রুতগতিতে হয়”।

এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি বেশ সুক্ষ্ম কারণ রয়েছে। তা হলো- কীভাবে এটি মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সহজ এই ভঙ্গিটি করতে কেবল মাংসপেশির শক্তি ও নমনীয়তাই লাগে, বিষয়টি এমন নয়। এটি করার জন্য প্রয়োজন মস্তিষ্কের সক্ষমতাও। অর্থাৎ মাংসপেশির শক্তি ও নমনীয়তার পাশাপাশি মস্তিষ্ক মূলত চোখ, ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা ও সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থার তথ্য সমন্বয় করে এক পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।

উল্লেখ্য, ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা হলো কানের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের কেন্দ্র এবং সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থা বলতে নার্ভের জটিল এক নেটওয়ার্ককে বোঝায়, যেটি শরীরের অবস্থান ও শরীর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তা বুঝতে সহায়তা করে।

এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে কাঠের মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী। তার এক হাতে একটি চায়ের পট যেটি পেটের কাছে ধরে আছেন, অন্য হাতে ধরা মগে চুমুক দিয়ে আছেন। পাশে একটি তাকের ওপর একটি ইলেকট্রিক কেটলি
দৈনন্দিন কাজের সময় এক পায়ে দাঁড়ানো ভারসাম্য উন্নত করার সময়সাশ্রয়ী উপায় হতে পারে

কাউফম্যান বলেন, “বয়সের সাথে সাথে এই ব্যবস্থাগুলো বিভিন্ন মাত্রায় কমতে শুরু করে”।

এর মানে হলো, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে–– এমনটাই বলেন এসপিরিতু ম্যাখেই।

পাশাপাশি কোনো কিছুর প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি, প্রতিদিনের কাজ করার সক্ষমতা এবং ইন্দ্রিয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য কত দ্রুততার সাথে সমন্বয় করা সম্ভব–– এই সবই জড়িত।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবারই মস্তিষ্কের সংকোচন ঘটে। কিন্তু যদি তা খুব আগেই শুরু হয়, তাহলে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং জীবনের শেষ বয়সে অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচা কঠিন হতে পারে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সংগ্রহৃত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের আঘাতপ্রাপ্তির অন্যতম কারণ হলো অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাওয়া। আর এটি সাধারণত ভারসাম্য রাখতে না পারার কারণেই ঘটে।

গবেষকেরা এমনও বলছেন যে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলন হতে পারে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর একটি ভালো পন্থা।

ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনের ব্যায়ামটি আসলেই ভারসাম্যের নিয়ন্ত্রণের উন্নতি এবং মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন ঘটায়।

কাউফম্যানের মতে, মানুষ প্রায়শই পড়ে যায় প্রতিক্রিয়ার ধীরগতির কারণে।

তিনি বলেন, “কল্পনা করুণ আপনি হাঁটছেন। ফুটপাতের একটি গর্তে আপনি হোঁচট খেলেন। এবার আপনি পড়বেন নাকি পড়বেন না, সেটির সাথে শক্তিমত্তার বিষয়টি জড়িত নয়, বরং কত দ্রুত আপনি গর্ত থেকে পা সরিয়ে যেখানে নেওয়া প্রয়োজন, সেখানে নিতে পারবেন, সেটিই বড় বিষয়”।

অদ্ভূত শোনালেও, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকা না থাকার সাথে অকাল মৃত্যুঝুঁকির একটা সম্পর্ক রয়েছে।

রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত
রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত

২০২২ সালের একটি গবেষণার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যবয়সে যারা এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের পরবর্তী সাত বছরে যে কোনো কারণে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৮৪ শতাংশ।

৫০ বছর থেকে ৫৯ বছর বয়সী দুই হাজার ৭৬০ জন নারী ও পুরুষকে নিয়ে তিনটি পরীক্ষা করা হয়েছিলো।

পরীক্ষাগুলো হলো-

১… গ্রিপের শক্তি বা কোনো কিছু আঁকড়ে হাত দিয়ে ধরে রাখার ক্ষমতা যাচাই।

২… এক মিনিটে তারা বসা থেকে কতবার দাঁড়াতে পারেন।

৩… চোখ বন্ধ রেখে তারা কতক্ষণ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন।

রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত হয়েছে। যারা এক পায়ে ১০ সেকেন্ড বা এর চেয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন, তাদের তুলনায় যারা দুই সেকেন্ড বা এর চেয়ে কম সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি পরবর্তী ১৩ বছরে তিনগুণ বেশি ছিল।

এসপিরিটু ম্যাকাইয়ের মতে, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে। মানে, যারা এক পায়ে ভারসাম্য রাখতে পারেন, তাদের স্মৃতিভ্রম ধীর গতিতে হয়।

তিনি আরো বলেন, আলঝেইমার রোগীদের মধ্যে যারা এক পায়ে পাঁচ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না , তাদের সাধারণত জ্ঞানীয় অবক্ষয় (স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব ইত্যাদি) বা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া দ্রুতগতিতে হয়।

একজন নারী সমুদ্রের পাড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করছেন

ভারসাম্যের প্রশিক্ষণ

ভালো খবর হলো, একের পর এক গবেষণা বলছে যে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনের মাধ্যমে বয়স সম্পর্কিত সমস্যার ঝুঁকি আমরা অনেকটাই কমাতে পারি।

এ ধরনের ব্যায়ামকে বিজ্ঞানীরা ‘সিঙ্গেল লেগ ট্রেইনিং’ বলছেন। এসব প্রশিক্ষণ কেবল কোমড়, নিতম্ব ও পায়ের মাংসপেশীই উন্নত করে না, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতিও করে।

এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক স্থির বা অপরিবর্তনশীল অঙ্গ নয়। এটি বেশ নমনীয় (অর্থাৎ বিকশিত হয়)। এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের ব্যায়ামটি আসলে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের উন্নতি করে। সেই সাথে মস্তিষ্ক যেভাবে গঠিত সেটিরও পরিবর্তন ঘটায়। বিশেষ করে, ইন্দ্রিয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় এবং শরীরের অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের যে অংশটি জড়িত সেই অংশটির”।

এক পায়ে শরীরের ভারসাম্য রাখা কগনেটিভ পারফর্মন্যান্স, অর্থাৎ মস্তিষ্কের দক্ষতা ও কার্যকারিতার উন্নতি ঘটায়। কারণ এটি করার সময়ে মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে এটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের ওয়ার্কিং মেমোরি বা সক্রিয় স্মৃতি উন্নত করতে পারে। (সক্রিয় স্মৃতি হলো মস্তিষ্কের একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া, যা সাময়িকভাবে তথ্য ধরে রেখে সেগুলোকে পরিচালনা, বিশ্লেষণ এবং বোঝার কাজে ব্যবহার করে।)

চলাফেরার সক্ষমতা বাড়াতে, সেই সাথে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনটি শুরু করার পরামর্শ দেন এসপিরিটু ম্যাকাই। তবে, তার মতে সবচেয়ে ভালো হয় যদি এটিকে প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ করা যায়।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ বার্ধ্যক্যে পৌঁছানোর আরও আগেই শুরু করলে আরো বেশি উপকার পাওয়া যেতে পারে।

রিও ডি জেনেইরোর ক্লিনিমেক্স ক্লিনিকের ব্যায়াম ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষক ক্লদিও গিল আরাউহো এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও অকাল মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ২০২২ সালে করা একটি গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি পঞ্চাশোর্ধ্ব সবাইকে ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারার সক্ষমতা নিজে নিজে যাচাই করার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, “এটি খুব সহজেই দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। দাঁত ব্রাশ করার সময় এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়ান, তারপর পা বদলে অন্য পায়ে ফের দাঁড়ান। আমি খালি পায়ে ও জুতা পরে—দু’ভাবেই করার পরামর্শ দিই, কারণ এগুলোর মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে”।

এর কারণ হলো, জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়।

জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়
জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়

গবেষকরা বলছেন, থালা বাসন ধোয়ার সময় সিংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বা দাঁত ব্রাশ করার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের জন্য দারুণ সুযোগ।

যতটা সম্ভব কম দুলে, যতক্ষণ পারেন ভঙ্গিটি ধরে রাখার চেষ্টা করুন। দিনে মাত্র ১০ মিনিট ভারসাম্যের চর্চাতেই এক্ষেত্রে উন্নতি করা সম্ভব।

হালকা চাপ বৃদ্ধির মাধ্যমে নিতম্বের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, যা আইসোকিনেটিক ব্যায়াম নামেও পরিচিত, সেটি এক পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্ট্রেন্থ, অ্যারোবিক ও ব্যালেন্স ট্রেইনিংয়ের সমন্বয় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট কারণগুলো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এ কারণেই যোগব্যায়াম বা তাই চি’র মতো শরীরচর্চা, যেগুলোয় প্রায়শই এক পায়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি ধরে রাখতে হয়, সেগুলো সুস্থ বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।

কফম্যান একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে তাই চি পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১৯ শতাংশ কমাতে সহায়ক।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো গিল আরাউজো দেখেছেন, নিয়মিত ও ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের কোঠায়ও ভালো ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব, এমনকি তারও পরে।

তিনি বলেন, “আমাদের ক্লিনিকে আমরা ৯৫ বছর বয়সী এক নারীকে পরীক্ষা করেছিলাম, যিনি ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন দুই পায়েই”।

“আমরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের জৈবিক ব্যবস্থার কর্মক্ষমতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত করতে পারি। সেটি আপনি শতায়ু হলেও সম্ভব”

বিবিসি বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদে ঢাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আশ্চর্যজনক উপকারিতা

০৫:২৭:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ অসুবিধাজনক মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা সময়ের জন্য ‌এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকায় নিজেকে অভ্যস্ত করাতে পারলে তা শরীরকে শক্তিশালী করে, স্মৃতিশক্তি উন্নত করে এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে।

আপনি যদি ফ্লামিঙ্গো (লম্বা পায়ের এক ধরনের পাখি) না হয়ে থাকেন, তবে এক পায়ে নাজুকভাবে দাঁড়িয়ে সময় কাটানোয় নিশ্চয়ই আপনি অভ্যস্ত নন। কাজেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই কাজ অবিশ্বাস্যরকমের কঠিন মনে হতে পারে আপনার কাছে।

যখন আমরা ছোট থাকি তখন এক পায়ে দাঁড়ানো নিয়ে খুব একটা চিন্তা আমাদের করতে হয় না। নয় থেকে ১০ বছর বয়সের মধ্যেই আমরা এভাবে দাঁড়ানো ভালোভাবে শিখে ফেলি। ৩০-এর কোঠার শেষ দিকে এক পায়ে দাঁড়ানোয় আমরা সর্বোচ্চ পারদর্শী হই এবং এরপর এই সক্ষমতা আবার কমতে শুরু করে।

কারো বয়স যদি ৫০ বছরের বেশি হয় এবং তিনি যদি এক পায়ে কয়েক সেকেন্ডের বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তবে সেটি তার সার্বিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং কতটা ভালোভাবে তিনি বার্ধক্যকে আলিঙ্গন করছেন সেটির ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু টলোমলো এক পায়ে আপনিই বা কেন দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে চাইবেন– এর পক্ষে বেশ কিছু ইতিবাচক কারণ রয়েছে। এটি আসলে শরীর ও মস্তিষ্কে বেশ কিছু উপকার বয়ে আনে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- পরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে, শারীরিক শক্তি বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে সহজ এই ব্যায়াম শরীরের ওপর বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

আমেরিকান একাডেমি অব ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের পুনর্বাসন চিকিৎসা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, “আপনার যদি মনে হয় এটি (এক পায়ে দাঁড়ানো) সহজ নয়, তবে ভারসাম্যের প্রশিক্ষণ শুরু করার সময় এখনই”।

(দৈনন্দিন জীবনে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রশিক্ষণ কীভাবে যুক্ত করবেন, তা এই আর্টিকেলের পরবর্তী অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।)

বাদামী প্যান্ট ও ধুসর টিশার্ট পরা কাঁধ পর্যন্ত সোনালী চুলের একজন নারী এক পা তুলে একটি ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। একপাশে একটি সোফা ও টবে লাগানো একটি গাছ। অন্যপাশে একটি ডায়নিং টেবিল ও তিনটি চেয়ার। টেবিলের ওপরে কাঁচের বোতলে ফুল, পাশে একটি ছোটো টবে একটি চারা। ঘরের কাচের বেড়ার অন্য পাশে একটি বারান্দা ও গাছপালা দেখা যাচ্ছে
বেশ কিছুটা সময় ধরে এক পায়ে দাঁড়ানোয় নিজেদের অভ্যস্ত করতে পারলে তা শরীরে বেশ কিছু উপকার বয়ে আনে

শরীরের ভারসাম্য নিয়ে কেন চিন্তা করতে হয়?

স্বাস্থ্যগত অবস্থা বুঝতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারাকে চিকিৎসকদের বিবেচনায় নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, বয়স বাড়ার সাথে সাথে পেশিক্ষয় বা সারকোপেনিয়ার যোগসূত্র। (গ্রিক শব্দ ‘সারকো’ অর্থ মাংসপেশি ও ‘পেনিয়া’ মানে অভাব বা ঘাটতি থেকে এই নাম এসেছে।)

৩০ বছরের পর মাংসপেশীর ভর (শরীরে যতটুকু মাংসপশেী আছে) প্রতি ১০ বছরে আট শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮০-তে পৌঁছানো প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের ক্লিনিক্যাল সারকোপেনিয়া দেখা দেয়।

এর সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস- এ সব কিছুর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্ত এটি যেহেতু বিভিন্ন ধরনের মাংসপেশীর ওপর প্রভাব ফেলে, কাজেই তা এক পায়ে দাঁড়াবার সক্ষমতা দিয়ে বোঝা যায়।

যারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার চর্চা করেন তাদের জীবনের পরবর্তী দশকগুলোয় সারকোপেনিয়া দেখা দেওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। কারণ সহজ ব্যায়ামটি পা ও নিতম্বের মাংসপেশীকে উন্নত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রোচেস্টারের মায়ো ক্লিনিকের মোশন অ্যানালাইসিস ল্যাবরেটরির পরিচালক কেন্টন কাউফম্যান বলেন, ” (বয়স বাড়ার সাথে সাথে) এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। ৫০ বা ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা যখন এটি (এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা কমা) প্রথম বুঝতে পারেন, এরপর তাদের জীবনের পরবর্তী দশকগুলোয় সেটি বেশ দ্রুতগতিতে হয়”।

এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি বেশ সুক্ষ্ম কারণ রয়েছে। তা হলো- কীভাবে এটি মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সহজ এই ভঙ্গিটি করতে কেবল মাংসপেশির শক্তি ও নমনীয়তাই লাগে, বিষয়টি এমন নয়। এটি করার জন্য প্রয়োজন মস্তিষ্কের সক্ষমতাও। অর্থাৎ মাংসপেশির শক্তি ও নমনীয়তার পাশাপাশি মস্তিষ্ক মূলত চোখ, ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা ও সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থার তথ্য সমন্বয় করে এক পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।

উল্লেখ্য, ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা হলো কানের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের কেন্দ্র এবং সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থা বলতে নার্ভের জটিল এক নেটওয়ার্ককে বোঝায়, যেটি শরীরের অবস্থান ও শরীর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তা বুঝতে সহায়তা করে।

এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে কাঠের মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী। তার এক হাতে একটি চায়ের পট যেটি পেটের কাছে ধরে আছেন, অন্য হাতে ধরা মগে চুমুক দিয়ে আছেন। পাশে একটি তাকের ওপর একটি ইলেকট্রিক কেটলি
দৈনন্দিন কাজের সময় এক পায়ে দাঁড়ানো ভারসাম্য উন্নত করার সময়সাশ্রয়ী উপায় হতে পারে

কাউফম্যান বলেন, “বয়সের সাথে সাথে এই ব্যবস্থাগুলো বিভিন্ন মাত্রায় কমতে শুরু করে”।

এর মানে হলো, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে–– এমনটাই বলেন এসপিরিতু ম্যাখেই।

পাশাপাশি কোনো কিছুর প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি, প্রতিদিনের কাজ করার সক্ষমতা এবং ইন্দ্রিয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য কত দ্রুততার সাথে সমন্বয় করা সম্ভব–– এই সবই জড়িত।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবারই মস্তিষ্কের সংকোচন ঘটে। কিন্তু যদি তা খুব আগেই শুরু হয়, তাহলে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং জীবনের শেষ বয়সে অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচা কঠিন হতে পারে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সংগ্রহৃত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের আঘাতপ্রাপ্তির অন্যতম কারণ হলো অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাওয়া। আর এটি সাধারণত ভারসাম্য রাখতে না পারার কারণেই ঘটে।

গবেষকেরা এমনও বলছেন যে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলন হতে পারে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর একটি ভালো পন্থা।

ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনের ব্যায়ামটি আসলেই ভারসাম্যের নিয়ন্ত্রণের উন্নতি এবং মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন ঘটায়।

কাউফম্যানের মতে, মানুষ প্রায়শই পড়ে যায় প্রতিক্রিয়ার ধীরগতির কারণে।

তিনি বলেন, “কল্পনা করুণ আপনি হাঁটছেন। ফুটপাতের একটি গর্তে আপনি হোঁচট খেলেন। এবার আপনি পড়বেন নাকি পড়বেন না, সেটির সাথে শক্তিমত্তার বিষয়টি জড়িত নয়, বরং কত দ্রুত আপনি গর্ত থেকে পা সরিয়ে যেখানে নেওয়া প্রয়োজন, সেখানে নিতে পারবেন, সেটিই বড় বিষয়”।

অদ্ভূত শোনালেও, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকা না থাকার সাথে অকাল মৃত্যুঝুঁকির একটা সম্পর্ক রয়েছে।

রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত
রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত

২০২২ সালের একটি গবেষণার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যবয়সে যারা এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের পরবর্তী সাত বছরে যে কোনো কারণে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৮৪ শতাংশ।

৫০ বছর থেকে ৫৯ বছর বয়সী দুই হাজার ৭৬০ জন নারী ও পুরুষকে নিয়ে তিনটি পরীক্ষা করা হয়েছিলো।

পরীক্ষাগুলো হলো-

১… গ্রিপের শক্তি বা কোনো কিছু আঁকড়ে হাত দিয়ে ধরে রাখার ক্ষমতা যাচাই।

২… এক মিনিটে তারা বসা থেকে কতবার দাঁড়াতে পারেন।

৩… চোখ বন্ধ রেখে তারা কতক্ষণ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন।

রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষাটিই সবচেয়ে কাজের বলে প্রমাণিত হয়েছে। যারা এক পায়ে ১০ সেকেন্ড বা এর চেয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন, তাদের তুলনায় যারা দুই সেকেন্ড বা এর চেয়ে কম সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি পরবর্তী ১৩ বছরে তিনগুণ বেশি ছিল।

এসপিরিটু ম্যাকাইয়ের মতে, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে। মানে, যারা এক পায়ে ভারসাম্য রাখতে পারেন, তাদের স্মৃতিভ্রম ধীর গতিতে হয়।

তিনি আরো বলেন, আলঝেইমার রোগীদের মধ্যে যারা এক পায়ে পাঁচ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না , তাদের সাধারণত জ্ঞানীয় অবক্ষয় (স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব ইত্যাদি) বা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া দ্রুতগতিতে হয়।

একজন নারী সমুদ্রের পাড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করছেন

ভারসাম্যের প্রশিক্ষণ

ভালো খবর হলো, একের পর এক গবেষণা বলছে যে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনের মাধ্যমে বয়স সম্পর্কিত সমস্যার ঝুঁকি আমরা অনেকটাই কমাতে পারি।

এ ধরনের ব্যায়ামকে বিজ্ঞানীরা ‘সিঙ্গেল লেগ ট্রেইনিং’ বলছেন। এসব প্রশিক্ষণ কেবল কোমড়, নিতম্ব ও পায়ের মাংসপেশীই উন্নত করে না, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতিও করে।

এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক স্থির বা অপরিবর্তনশীল অঙ্গ নয়। এটি বেশ নমনীয় (অর্থাৎ বিকশিত হয়)। এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের ব্যায়ামটি আসলে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের উন্নতি করে। সেই সাথে মস্তিষ্ক যেভাবে গঠিত সেটিরও পরিবর্তন ঘটায়। বিশেষ করে, ইন্দ্রিয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় এবং শরীরের অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের যে অংশটি জড়িত সেই অংশটির”।

এক পায়ে শরীরের ভারসাম্য রাখা কগনেটিভ পারফর্মন্যান্স, অর্থাৎ মস্তিষ্কের দক্ষতা ও কার্যকারিতার উন্নতি ঘটায়। কারণ এটি করার সময়ে মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে এটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের ওয়ার্কিং মেমোরি বা সক্রিয় স্মৃতি উন্নত করতে পারে। (সক্রিয় স্মৃতি হলো মস্তিষ্কের একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া, যা সাময়িকভাবে তথ্য ধরে রেখে সেগুলোকে পরিচালনা, বিশ্লেষণ এবং বোঝার কাজে ব্যবহার করে।)

চলাফেরার সক্ষমতা বাড়াতে, সেই সাথে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলনটি শুরু করার পরামর্শ দেন এসপিরিটু ম্যাকাই। তবে, তার মতে সবচেয়ে ভালো হয় যদি এটিকে প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ করা যায়।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ বার্ধ্যক্যে পৌঁছানোর আরও আগেই শুরু করলে আরো বেশি উপকার পাওয়া যেতে পারে।

রিও ডি জেনেইরোর ক্লিনিমেক্স ক্লিনিকের ব্যায়াম ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষক ক্লদিও গিল আরাউহো এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও অকাল মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ২০২২ সালে করা একটি গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি পঞ্চাশোর্ধ্ব সবাইকে ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারার সক্ষমতা নিজে নিজে যাচাই করার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, “এটি খুব সহজেই দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। দাঁত ব্রাশ করার সময় এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়ান, তারপর পা বদলে অন্য পায়ে ফের দাঁড়ান। আমি খালি পায়ে ও জুতা পরে—দু’ভাবেই করার পরামর্শ দিই, কারণ এগুলোর মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে”।

এর কারণ হলো, জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়।

জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়
জুতা পরে এক পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় খালি পায়ে দাঁড়ালে ভারসাম্যের মাত্রা ভিন্ন হয়

গবেষকরা বলছেন, থালা বাসন ধোয়ার সময় সিংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বা দাঁত ব্রাশ করার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের জন্য দারুণ সুযোগ।

যতটা সম্ভব কম দুলে, যতক্ষণ পারেন ভঙ্গিটি ধরে রাখার চেষ্টা করুন। দিনে মাত্র ১০ মিনিট ভারসাম্যের চর্চাতেই এক্ষেত্রে উন্নতি করা সম্ভব।

হালকা চাপ বৃদ্ধির মাধ্যমে নিতম্বের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, যা আইসোকিনেটিক ব্যায়াম নামেও পরিচিত, সেটি এক পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্ট্রেন্থ, অ্যারোবিক ও ব্যালেন্স ট্রেইনিংয়ের সমন্বয় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট কারণগুলো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এ কারণেই যোগব্যায়াম বা তাই চি’র মতো শরীরচর্চা, যেগুলোয় প্রায়শই এক পায়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি ধরে রাখতে হয়, সেগুলো সুস্থ বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।

কফম্যান একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে তাই চি পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১৯ শতাংশ কমাতে সহায়ক।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো গিল আরাউজো দেখেছেন, নিয়মিত ও ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের কোঠায়ও ভালো ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব, এমনকি তারও পরে।

তিনি বলেন, “আমাদের ক্লিনিকে আমরা ৯৫ বছর বয়সী এক নারীকে পরীক্ষা করেছিলাম, যিনি ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলেন দুই পায়েই”।

“আমরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের জৈবিক ব্যবস্থার কর্মক্ষমতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত করতে পারি। সেটি আপনি শতায়ু হলেও সম্ভব”

বিবিসি বাংলা