ইউক্রেনে তীব্র শীতের চাপ আর দুর্বল হয়ে পড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মধ্যে আগামী সপ্তাহে নতুন করে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা বসতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আয়োজিত এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আগামী চার ও পাঁচ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হবে। একই সময়ে জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে চলমান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
যুদ্ধের চাপ ও শান্তির চেষ্টা
প্রায় চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিয়েভের ওপর শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ বাড়ছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাশিয়ার টানা বিমান হামলা, যা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চলতি শীতকে সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম কঠিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জানুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত আলোচনার প্রথম দফা থেকে কোনো অগ্রগতি আসেনি। বিশেষ করে ভূখণ্ড নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো বিপরীত। রাশিয়া পূর্বাঞ্চলের আরও এলাকা ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানালেও ইউক্রেন তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জেলেনস্কির ভাষায়, ইউক্রেন অর্থবহ আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং এমন সমাধান চায় যা যুদ্ধের সম্মানজনক অবসান ঘটাতে পারে।
কিয়েভে তাপ ও বিদ্যুৎ সংকট
এদিকে রাজধানী কিয়েভে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। রোববার পর্যন্ত প্রায় সাতশ অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে তাপ সরবরাহ বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী। শহরের তাপমাত্রা মাইনাস পনের ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে গেলে শনিবার বড় ধরনের গ্রিড বিপর্যয় দেখা দেয়। এতে কিয়েভের প্রায় সাড়ে তিন হাজার উঁচু ভবনে বিদ্যুৎ ও গরমের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
কর্তৃপক্ষ সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতির কথা না বললেও, এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই প্রভাব পাশের দেশ মলদোভাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে ধোঁয়াশা
কয়েক দিন আগে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে রাশিয়া রোববার পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। ইউক্রেনও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিয়েভের মতে, এই স্থগিতাদেশ পরের শুক্রবার পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল। যদিও সাম্প্রতিক দিনে বড় ধরনের হামলার খবর না থাকলেও জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া এখনো আকাশপথে হামলার মাধ্যমে সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রাণহানি ও ক্ষোভ
দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনে ড্রোন হামলায় দিনিপ্রো শহরে একটি বাড়িতে দুইজন নিহত হন। জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে একটি মাতৃসদন ও আবাসিক এলাকায় হামলায় আহত হন আরও নয়জন। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা আরও তীব্র হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার এক বাসিন্দা প্রশ্ন তুলেছেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না হলেও সাধারণ মানুষ কেন নিরাপদ নয়।
বিদ্যুৎ ফেরানোর চেষ্টা
বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানি জানিয়েছে, উপকূলীয় ওডেসা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর তিন লাখ পরিবারের সংযোগ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক নয়। গ্রিড অপারেটরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার কিয়েভে তাপমাত্রা মাইনাস বিশ ডিগ্রির নিচে নামতে পারে এবং সারা দেশে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট চালু থাকবে।
শক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জানুয়ারিতে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করে ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে।

আশার পাশাপাশি বাস্তবতা
অনেক ইউক্রেনীয় এখনো শান্তি আলোচনার ফল নিয়ে সংশয়ে। কিয়েভের এক প্রবীণ যুদ্ধাহত বলেছেন, আলোচনা চললেও হামলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। শান্তির আশা থাকলেও দেশকে রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও প্রয়োজন—এটাই এখন বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















