ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। চলতি সপ্তাহের শুক্রবার তুরস্কে এই বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও পারস্পরিক হুমকির আবহে এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা কমাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে পারমাণবিক সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, অন্যদিকে চুক্তি না হলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’র হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। একই সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার নির্দেশ দিয়েছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে।
আলোচনার প্রেক্ষাপট
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নতুন করে চরম উত্তেজনায় পৌঁছায়। বিক্ষোভ দমনে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা নিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন আলোচনা।
ইরানের অবস্থান ও বার্তা
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কূটনীতিতে বিশ্বাসী এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চায়। তবে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আলোচনার কাঠামো ও পদ্ধতি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান–প্রদান হচ্ছে।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরান শর্তহীন আলোচনায় আগ্রহী এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে সীমিত ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতিও দেখাতে পারে। তবে আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা কমানোর দাবি তুলেছে তেহরান।
তুরস্কে সম্ভাব্য বৈঠক
আরব কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন। পাশাপাশি সৌদি আরব, মিসর, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকতে পারেন। এই বৈঠকের লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা কমানো।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ও ইরানের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা আরোপ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান এসব শর্তকে সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে ইরানের অভ্যন্তরে শীর্ষ পর্যায়ে আশঙ্কা বাড়ছে, কোনো সামরিক হামলা হলে তা নতুন করে গণঅভ্যুত্থান উসকে দিতে পারে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও জনরোষ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত মাসের দমন অভিযানের পর জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ভয় আর কার্যকর বাধা নয়। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বাহ্যিক সামরিক চাপ জনগণকে আবার রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করতে পারে এবং এতে রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সাধারণ মানুষের কণ্ঠ
তেহরানের এক অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক বলেন, যুদ্ধের ভয় তাঁর নেই, তবে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ভয়াবহ। তাঁর মতে, শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব সমাধান দরকার। অর্থনৈতিক চাপ থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল এবং সেই ক্ষোভ এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
ভবিষ্যৎ কী
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই আলোচনা শুধু পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কূটনীতির পথ কতটা সফল হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















