বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন বৈশ্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। সংস্থাটির ক্যান্সার গবেষণা শাখার সঙ্গে যৌথভাবে করা এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে বিপুল সংখ্যক নতুন ক্যান্সার আক্রান্তের ঘটনা এড়ানো যেতে পারে।
গবেষণায় তামাক ব্যবহার, অ্যালকোহল সেবন, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বায়ুদূষণ, অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিভিন্ন সংক্রমণসহ মোট ত্রিশটি প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকির কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। চলতি শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুর তথ্য অনুযায়ী, এসব কারণই নতুন শনাক্ত ক্যান্সারের উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসকে সামনে রেখে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, সাম্প্রতিক এক বছরে নতুন শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারের প্রায় সাঁইত্রিশ শতাংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত, যার সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের বেশি। গবেষণাটি একশ পঁচাশি দেশের তথ্য এবং ছত্রিশ ধরনের ক্যান্সার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

তামাক এখনো সবচেয়ে বড় প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি
বিশ্বব্যাপী নতুন ক্যান্সারের মধ্যে সবচেয়ে বড় একক প্রতিরোধযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তামাক ব্যবহার। এর পরেই রয়েছে সংক্রমণজনিত কারণ এবং অ্যালকোহল সেবন। প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের প্রায় অর্ধেকই ফুসফুস, পাকস্থলী ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের সঙ্গে যুক্ত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ফুসফুস ক্যান্সারের প্রধান কারণ ধূমপান ও বায়ুদূষণ, পাকস্থলীর ক্ষেত্রে একটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষকরা বলছেন, প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিবর্তনযোগ্য কারণ থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা আসে তা পরিমাপ করা হয়েছে। অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভেদে প্রবণতা বিশ্লেষণ করায় সরকার ও সাধারণ মানুষ উভয়ের জন্যই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার বাস্তবভিত্তিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুরুষ ও নারীর ঝুঁকিতে পার্থক্য
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার পুরুষদের মধ্যে নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে ধূমপানই প্রধান ঝুঁকি, এরপর রয়েছে সংক্রমণ ও অ্যালকোহল সেবন। নারীদের মধ্যে সংক্রমণজনিত কারণ শীর্ষে, এরপর ধূমপান এবং অতিরিক্ত দেহভর সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অঞ্চলভেদে পার্থক্য
কিছু অঞ্চলে নারীদের প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার তুলনামূলক কম হলেও অন্য অঞ্চলে তা অনেক বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে ও পূর্ব এশিয়ায় সর্বোচ্চ হার এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সর্বনিম্ন হার লক্ষ্য করা গেছে। ঝুঁকির এই বৈচিত্র্যের পেছনে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, স্বাস্থ্যনীতি, প্রতিরোধ কর্মসূচি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুযোগ
প্রতিবেদনটিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ, অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ নীতি, ক্যান্সার সৃষ্টিকারী সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকাদান, দূষণমুক্ত পরিবেশ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে পারলে বৈশ্বিক ক্যান্সারের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, পরিবহন ও শ্রম খাত সহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য কারণগুলো মোকাবিলা করা গেলে শুধু ক্যান্সারের হারই কমবে না, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















