চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল এবং বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা ছয় দিনের কর্মবিরতিতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। এই কর্মসূচির ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে অর্থনীতি। আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে নৌপরিবহন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে পৌঁছালে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে বৈঠকের আশ্বাসে শ্রমিকরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি স্থগিত করলেও দাবি না মানা হলে পুনরায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ছয় দিনের অচলাবস্থায় বন্দর কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির
টানা কর্মবিরতির কারণে কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস ও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কোনো জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি এবং বহির্নোঙরে অন্তত ১৪০টির বেশি জাহাজ আটকে পড়ে। এর মধ্যে রমজান উপলক্ষে আনা ভোগ্যপণ্যবাহী বহু জাহাজ ছিল। নির্ধারিত সময়ে এসব পণ্য খালাস না হলে রমজানের বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিতে বিপুল ক্ষতি ও রাজস্ব ঘাটতি
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অধিকাংশ পণ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় এই অচলাবস্থা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ সৃষ্টি করেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও ছয় দিনে প্রায় ৫৪ হাজার টিইইউএস কনটেইনারের জট তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হিসেবে ছয় দিনে রাজস্ব ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে জাহাজের ডেমারেজ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ থেকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা

শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলছেন, কাঁচামাল আটকে থাকায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, বন্দরের অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের জট দীর্ঘ হলে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়বে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতেও বিদেশি অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যৌথ বিবৃতিতে দ্রুত সমাধানের আহ্বান
দশটি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে জানায়, বন্দরের ইতিহাসে এই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে। তাঁদের মতে, বন্দর এক দিন বন্ধ থাকলেই অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে এবং রমজান ও ঈদের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ওপর সরাসরি চাপ পড়বে।

উপদেষ্টাকে ঘিরে বিক্ষোভ, পরে বৈঠক
নৌপরিবহন উপদেষ্টা চট্টগ্রামে পৌঁছালে কয়েক হাজার শ্রমিক বন্দর ভবনের সামনে জড়ো হয়ে তাঁর গাড়িবহর আটকে বিক্ষোভ দেখান এবং নানা স্লোগান দেন। প্রায় ১৫ মিনিট অবরুদ্ধ থাকার পর তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে তিনি জানান, ইজারা প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের বিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বন্দর বন্ধ রেখে দেশকে জিম্মি করা যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। কাজ বাধাগ্রস্ত হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হবে বলেও জানান।
সাময়িক স্থগিত কর্মসূচি, রোববার পর্যন্ত আলটিমেটাম
উপদেষ্টার আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইজারা বাতিল ও চেয়ারম্যান অপসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না এলে আরও বড় আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















