ম্যাকিয়াভেলি লিখেছিলেন, শাসকের ভয় জাগানো দরকার হলেও ঘৃণা ডেকে আনা চলবে না। সেই মানদণ্ডে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এখন কঠিন সংকটে। বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক হত্যাকান্ড মানুষের মনে ভয়ের চেয়ে ক্ষোভ ই বাড়িয়ে তুলছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে, আরও বহু মৃত্যুর তথ্য যাচাই চলছে। বিরোধী একটি গণমাধ্যমের দাবি, নিহতের সংখ্যা কয়েক দশ হাজারের বেশি। নিহতদের মরদেহ ফেরত পেতে ও পরিবারের কাছ থেকে গুলির দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রক্তাক্ত দমন আর জ্বলন্ত শহরের ছবি
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বিক্ষোভ ও দমনের পর অনেক এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে গেছে। পোড়া ব্যাংক ও মসজিদ, উল্টে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি—সব মিলিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, শাসন ও দমন যন্ত্রের প্রতীক যা কিছু ছিল, সবই আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছে। এতে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ জনগণ আরও চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। প্রশ্ন উঠছে, এত রক্তপাতের পর দেশ হিসেবে ইরান কতটা অটুট থাকতে পারবে।
রাজপথে নিয়ন্ত্রণ আর সহিংসতার বিস্তার
জানুয়ারির এক দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়। আগুন, ধ্বংসস্তূপ আর সংঘর্ষে পরিস্থিতি অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে, মুখোশধারী সশস্ত্র লোকজন সরকারপন্থী স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অনেকের মতে, বাস্তবে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা উচ্চারণ করা হচ্ছে না।
বিভক্ত সমাজ, বাড়ছে প্রতিশোধের ডাক
বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় এই দেশে বিভাজন দ্রুত গভীর হচ্ছে। শাসক পক্ষ ও বিরোধীরা একে অপরকে ভাড়াটে বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগ দিচ্ছে। প্রবাসী রাজতন্ত্র পন্থী নেতৃত্ব আত্মরক্ষার অধিকার জোর দিয়ে তুলে ধরছে এবং বিদেশি হামলার আহ্বান জানাচ্ছে। সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত নেই; শাসনব্যবস্থা ক্রমেই নিরাপত্তা কেন্দ্রিক কঠোর রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে, আর সব বিরোধী কে সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে।

অস্ত্রধারণের চিন্তা ও অতীতের ছায়া
দেশের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী শিবিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। কোথাও কোথাও সামাজিক মাধ্যমে অস্ত্র হাতে প্রতিশোধের ঘোষণা দেখা যাচ্ছে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি কি লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো সশস্ত্র বিদ্রোহে গড়াতে পারে। অথচ আরব বসন্ত-পরবর্তী দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হচ্ছে।
বিক্ষোভের চরিত্র বদল ও চরম স্লোগান
আগে ইরানের বিক্ষোভে মধ্যবিত্তের উপস্থিতি বেশি ছিল, এখন দারিদ্র্যের চাপে নিম্নস্তরের মানুষই প্রধান শক্তি। অনেকেই ধর্মীয় প্রতীক ছেড়ে রাজতান্ত্রিক প্রতীকে ঝুঁকছে, স্লোগানে ও দেখা যাচ্ছে তীব্র ইসলামবিরোধী ভাষা। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে থাকা কণ্ঠ গুলো ক্রমেই চাপা পড়ে যাচ্ছে, আর প্রতিশোধের ভয় সমাজ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের অনিশ্চিত পরিণতি
সমুদ্র উপকূলে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়ার খবরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। অতীতে বিদেশি শক্তির সহায়তায় ইরানে একাধিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পথ তৈরি হয়। ইরাক ও লিবিয়ায় শাসক পতনের পর যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তা সতর্কবার্তা হয়ে আছে। বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















