ইউএনবি
বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিপুলসংখ্যক ভোটার এখনো কোনো দল বেছে নেওয়ার বদলে বলছেন, তারা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। এমন একটি দেশে এই প্রবণতা বিস্ময়কর, যেখানে সাধারণত নির্বাচনের ফল অনেকটাই পূর্বানুমেয় হয়ে থাকে। ফলে অনির্ধারিত ভোটাররা এই প্রতিযোগিতায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পরিচালিত দেশব্যাপী পালস জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার এখনো ঠিক করেননি কাকে সমর্থন করবেন। আট মাস আগে এই হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। একই জরিপে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দিতে পারেন তা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ বলেন তারা ভোটই দেবেন না। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারণা জোরদার হওয়া, বিতর্ক আয়োজন এবং সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেও প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনো ভাবনার পর্যায়ে রয়েছেন।
অনির্ধারিত ভোটারের প্রকৃত আকার কত
বিভিন্ন জনমত জরিপে একই ধরনের অনিশ্চয়তার চিত্র উঠে এসেছে।
ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভের সাম্প্রতিক তৃতীয় ধাপে দেখা যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোটারদের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থন ৩১ শতাংশ। তবে একই জরিপে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার দল নির্বাচনের ক্ষেত্রেই অনির্ধারিত।

একই জরিপে নেতৃত্বসংক্রান্ত পূর্বাভাসেও অনিশ্চয়তা দেখা যায়। প্রায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলতে পারেননি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। অন্যদিকে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্দিষ্ট একজন নেতার নাম বলেছেন এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অন্য একজনকে বেছে নিয়েছেন।
তরুণ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেশি। যুবকেন্দ্রিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ ভোট নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন এবং তুলনামূলক কমসংখ্যক তরুণ নির্দিষ্ট দল বা নেতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এই অনির্ধারিত ভোটাররা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নন। তাদের সংখ্যা বড় বড় ভোটব্যাংকের সমান, ফলে তাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
মাঠের কণ্ঠস্বর
যেসব ভোটার ভোট দিতে অনাগ্রহী বলে জানান, তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রায়ই নীরব প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। অনেকেই কারণ ব্যাখ্যা না করেই মন্তব্য করতে চান না। তবুও কয়েকজন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মতামত দিয়েছেন, যা পরিসংখ্যানের পেছনের দ্বিধাকে বুঝতে সাহায্য করে।
ঢাকার একটি প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক তরুণ শিক্ষক বলেন, এই নির্বাচনের রাজনৈতিক বিন্যাস অস্বাভাবিক। তার ভাষায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুটি শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিনের মিত্র এবং তাদের আদর্শিক অবস্থানেও মিল রয়েছে। বড় একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতির কারণে তারা এখন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সেই অনুপস্থিতিই ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করছে।

তিনি মনে করেন, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে যে অংশগ্রহণ ঘাটতি ছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি। তার মতে, একই কারণে ত্রয়োদশ নির্বাচনেও পূর্ণ অংশগ্রহণের অভাব রয়েছে এবং ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ কারণেই কিছু ভোটার ভোটকেন্দ্র এড়িয়ে যেতে পারেন।
নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোট প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক সমর্থন জানান। তার মতে, এতে ভবিষ্যৎ সরকারকে জবাবদিহিমূলক করার ইতিবাচক দিক আছে, কিন্তু প্রশ্নগুলোর বিন্যাস সমস্যাজনক। একাধিক বিষয় একত্র করে ভোটারদের কেবল হ্যাঁ বা না বলতে বলা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, সুপ্রিম কোর্টসংক্রান্ত প্রস্তাব এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে যুক্তিসঙ্গত মতভেদ থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, এত জটিল বিষয়ে একক হ্যাঁ বা না সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তাছাড়া দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ নিরক্ষর এবং অনেক ভোটার গণভোটের বিষয়বস্তু পুরোপুরি বোঝেন না। প্রশ্ন না বুঝে দেওয়া ভোট কতটা অর্থবহ, সে প্রশ্নও তিনি তোলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির এক শিক্ষার্থী তুলনামূলক বাস্তববাদী মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি তেমন কিছু আশা করছেন না। এবার তিনি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার পক্ষে থাকা শক্তির পক্ষে ভোট দেবেন, যা তার কাছে বিএনপি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী আরও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তিনি ভোট দেবেন না। তার দাবি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি এবং বরং একটি গোষ্ঠী ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। এই নির্বাচনের পরও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে তিনি মনে করেন না।
এই নির্বাচনে ডাকযোগে প্রবাসী ভোটার অন্তর্ভুক্ত হওয়াও নতুন একটি উপাদান। তবে প্রবাসীদের মধ্যেও উৎসাহ সীমিত। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সুমাইয়া জান্নাত বলেন, তিনি এটিকে প্রকৃত নির্বাচন মনে করেন না, বরং জনগণকে শান্ত রাখার এক ধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কাশপিয়া বাধন জানান, তার সমর্থিত দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে থাকলে ভয় বা সামাজিক চাপে ভোটকেন্দ্রে যেতে হতো, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় ভোট দেওয়া তার জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
এসব মতামত দেখায়, সিদ্ধান্তহীনতা কেবল উদাসীনতা নয়; বরং অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব এবং ভোটের অর্থ নিয়ে গভীর সংশয়ের ফল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ অনির্ধারিত ভোটাররা
সাধারণত নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে অনির্ধারিত ভোটার কমে যায়। প্রচারণা তীব্র হয়, আনুগত্য দৃঢ় হয় এবং ফল পূর্বানুমেয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ভিন্ন। আগে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি প্রতিযোগিতার কাঠামো বদলে দিয়েছে এবং অনেক ভোটার ঠিক এই কারণেই অনিশ্চিত রয়ে গেছেন।
অনির্ধারিত ভোটাররা শুধু দলীয় প্রতিযোগিতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নন; তাদের মতামত নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটের প্রতিও প্রভাব ফেলে। এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে, আর ১২ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।

অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সময়মতো নির্বাচনের দাবি ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে। অর্থাৎ অনির্ধারিত ভোটাররা বিমূর্ত রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবছেন।
ভোটার আস্থার চিত্র
অনিশ্চয়তা থাকলেও কিছু সূচক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর তুলনামূলক আস্থা দেখায়। এক জরিপে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে এবং ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দেওয়ার আশা করেন।
এতে বোঝা যায়, অনেক অনির্ধারিত ভোটার প্রক্রিয়াটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন না; বরং অপরিচিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের বিকল্পগুলো সতর্কভাবে বিবেচনা করছেন।

শেষ মুহূর্ত
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, অনির্ধারিত ভোটাররাই বাংলাদেশের নির্বাচনী সমীকরণের সবচেয়ে অনিশ্চিত উপাদান হয়ে উঠছেন। শেষ মুহূর্তের তাদের সিদ্ধান্ত আসনভিত্তিক ফল এবং জাতীয় ফলাফল—দুটোতেই প্রভাব ফেলতে পারে, যা আগাম জরিপে ধরা নাও পড়তে পারে।
সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও নাগরিক—সবার জন্যই এই গোষ্ঠীর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তারা কেন দ্বিধায় থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত কী তাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, তা বোঝা গেলে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া সম্ভব।
নীরব পটভূমির কণ্ঠস্বর হয়ে না থেকে, অনির্ধারিত ভোটাররাই হয়তো শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের গতি নির্ধারণ করবেন।
Sarakhon Report 



















