০৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ভোটের পর ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী, নির্বাচন এলেই কেন এই কথা শোনা যায়? রাশিয়ার শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো বিপর্যস্ত রোবোট্যাক্সি সেবার বিস্তারে স্মার্ট যাতায়াতে নতুন গতি আবুধাবিতে সবার জীবনে সঙ্গীতের প্রয়োজনীয়তা, দুবাইয়ের অধ্যাপকের গবেষণায় নতুন দিগন্ত আল আইনে আলোকিত ফুলের মহোৎসব, দেড় হাজার ঝলমলে পাপড়িতে ফুটে উঠল ভিন্নতার বার্তা শিল্প ও ক্রীড়া ঐক্যে দুবাইয়ে সম্মাননা পেলেন আহমেদ আল জাসমি শারজাহর আল ধাইদে সাহিত্য পরিষদ উদ্বোধন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সৃজনশীল চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন জুনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, বৈঠকের প্রস্তাব ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় ওমানের ভূমিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশংসা, আঞ্চলিক শান্তির আশা জোরদার

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে দৈনন্দিন সংগ্রামে নেই নির্বাচনী উত্তাপ

ইউএনবি

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক আবহ ক্রমেই তীব্র হলেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে তার প্রভাব খুব কমই অনুভূত হচ্ছে।

এখানকার বাসিন্দাদের কাছে নির্বাচনী রাজনীতির চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবা পাওয়া, পরিবারের বেঁচে থাকা এবং সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা—এসব চিন্তাই তাদের দিনযাপনের কেন্দ্রবিন্দু।

ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালীর আলগা, গোয়ালপুরি, পূর্ব ঝুনকা, অষ্টাশির চর, চিরা খাঁ ও খেয়ার চরসহ প্রায় ২০টি চরে প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটার বাস করেন। তাদের অনেকেই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী নন। অনেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট কী, সেটিও জানেন না; ভোটপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও তাদের ধারণা সীমিত।

দারিদ্র্য ও নদীভাঙনই এই দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামের এসব এলাকার মানুষের জীবন নদীনির্ভর এবং অত্যন্ত অনিশ্চিত। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনে প্রতি বর্ষায় ভেসে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা।

ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তা—কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নির্বাচনী উদাসীনতা চরমে

ভোটের চেয়ে টিকে থাকার চিন্তা

কালীর আলগা চরের বাসিন্দা জামাল বলেন, ভোট দিয়ে কী হবে? নদী তো ভাঙছেই। আজ ঘর আছে, কাল নেই। এই চিন্তার মধ্যে ভোটের কথা মনে আসে না।

গোয়ালপুরি চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোটের সময় কেউ আসে না, এলেও ভোট শেষ হলেই চলে যায়। তাই ভোট নিয়ে ভাবার সময়ই নেই।

শিক্ষা ও চিকিৎসায় সংকট

চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষকরা নিয়মিত না আসায় শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় ভেঙে পড়েছে।

পূর্ব ঝুনকা চরের এক অভিভাবক জানান, স্কুল আছে, কিন্তু মাসে কয় দিন শিক্ষক আসেন কেউ জানে না। এতে শিশুদের পড়াশোনা পিছিয়ে পড়ছে।

চিকিৎসাব্যবস্থাও অত্যন্ত অনিশ্চিত। স্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিরা খাঁ চরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, অসুস্থ হলে নৌকা পাওয়া কঠিন। শহরে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। তখন ভোটের কথা ভাববে কে?

চর রাজিবপুর: কুড়িগ্রামের এই এলাকা কেন সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল - BBC News বাংলা

চরবাসীর আস্থা হারানোর কারণ

কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলায় ১৬টি দ্বীপচরসহ মোট ৪৬৯টি চর রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটার।

এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এসব এলাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় চরবাসী আস্থা হারিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনেও মানুষের আগ্রহ কম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম অন্যতম দরিদ্র। প্রায় ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি।

তিনি আরও বলেন, আগের সরকারগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণে শুধু চরাঞ্চল নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যেও ভোটে অনীহা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ভোটার নীরব থাকেন, ফলে কে জিতবে তা অনুমান করা কঠিন।

উন্নয়ন ছাড়া আগ্রহ নেই

ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তা—কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নির্বাচনী উদাসীনতা  চরমে - বাহের দেশ

চরবাসীর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারণা মূল ভূখণ্ড ও শহরকেন্দ্রিক; চরাঞ্চল উপেক্ষিত থাকে। খেয়ার চরের যুবক আল আমিন বলেন, কেউ প্রচারণায় চরে আসে না। উন্নয়ন না হলে মানুষ ভোটে আগ্রহী হবে কীভাবে?

বাসিন্দারা জানান, তারা ভোটের বিরোধী নন। তবে নির্বাচন শেষে বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান, শুধু নির্বাচনের আগে নয়।

তাদের মতে, নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হলেই ভোটের প্রকৃত অর্থ তৈরি হবে।

চরবাসীর একটাই দাবি—নির্বাচনের আগে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। মৌলিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোটের পর ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে দৈনন্দিন সংগ্রামে নেই নির্বাচনী উত্তাপ

০২:৫৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ইউএনবি

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক আবহ ক্রমেই তীব্র হলেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে তার প্রভাব খুব কমই অনুভূত হচ্ছে।

এখানকার বাসিন্দাদের কাছে নির্বাচনী রাজনীতির চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবা পাওয়া, পরিবারের বেঁচে থাকা এবং সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা—এসব চিন্তাই তাদের দিনযাপনের কেন্দ্রবিন্দু।

ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালীর আলগা, গোয়ালপুরি, পূর্ব ঝুনকা, অষ্টাশির চর, চিরা খাঁ ও খেয়ার চরসহ প্রায় ২০টি চরে প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটার বাস করেন। তাদের অনেকেই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী নন। অনেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট কী, সেটিও জানেন না; ভোটপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও তাদের ধারণা সীমিত।

দারিদ্র্য ও নদীভাঙনই এই দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামের এসব এলাকার মানুষের জীবন নদীনির্ভর এবং অত্যন্ত অনিশ্চিত। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনে প্রতি বর্ষায় ভেসে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা।

ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তা—কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নির্বাচনী উদাসীনতা চরমে

ভোটের চেয়ে টিকে থাকার চিন্তা

কালীর আলগা চরের বাসিন্দা জামাল বলেন, ভোট দিয়ে কী হবে? নদী তো ভাঙছেই। আজ ঘর আছে, কাল নেই। এই চিন্তার মধ্যে ভোটের কথা মনে আসে না।

গোয়ালপুরি চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোটের সময় কেউ আসে না, এলেও ভোট শেষ হলেই চলে যায়। তাই ভোট নিয়ে ভাবার সময়ই নেই।

শিক্ষা ও চিকিৎসায় সংকট

চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষকরা নিয়মিত না আসায় শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় ভেঙে পড়েছে।

পূর্ব ঝুনকা চরের এক অভিভাবক জানান, স্কুল আছে, কিন্তু মাসে কয় দিন শিক্ষক আসেন কেউ জানে না। এতে শিশুদের পড়াশোনা পিছিয়ে পড়ছে।

চিকিৎসাব্যবস্থাও অত্যন্ত অনিশ্চিত। স্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিরা খাঁ চরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, অসুস্থ হলে নৌকা পাওয়া কঠিন। শহরে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। তখন ভোটের কথা ভাববে কে?

চর রাজিবপুর: কুড়িগ্রামের এই এলাকা কেন সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল - BBC News বাংলা

চরবাসীর আস্থা হারানোর কারণ

কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলায় ১৬টি দ্বীপচরসহ মোট ৪৬৯টি চর রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটার।

এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এসব এলাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় চরবাসী আস্থা হারিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনেও মানুষের আগ্রহ কম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম অন্যতম দরিদ্র। প্রায় ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি।

তিনি আরও বলেন, আগের সরকারগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণে শুধু চরাঞ্চল নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যেও ভোটে অনীহা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ভোটার নীরব থাকেন, ফলে কে জিতবে তা অনুমান করা কঠিন।

উন্নয়ন ছাড়া আগ্রহ নেই

ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তা—কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নির্বাচনী উদাসীনতা  চরমে - বাহের দেশ

চরবাসীর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারণা মূল ভূখণ্ড ও শহরকেন্দ্রিক; চরাঞ্চল উপেক্ষিত থাকে। খেয়ার চরের যুবক আল আমিন বলেন, কেউ প্রচারণায় চরে আসে না। উন্নয়ন না হলে মানুষ ভোটে আগ্রহী হবে কীভাবে?

বাসিন্দারা জানান, তারা ভোটের বিরোধী নন। তবে নির্বাচন শেষে বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান, শুধু নির্বাচনের আগে নয়।

তাদের মতে, নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হলেই ভোটের প্রকৃত অর্থ তৈরি হবে।

চরবাসীর একটাই দাবি—নির্বাচনের আগে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। মৌলিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।