বিশ্বব্যাপী নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালে গোপনে পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন নতুন ও বিস্তৃত অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তির আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক ওয়ারহেড সীমাবদ্ধকারী নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন পরই এই অভিযোগ সামনে আসে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
গোপন পরীক্ষার অভিযোগ
জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি থমাস ডিন্যানো জানান, চীন পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা চালিয়েছে এবং শত শত টন ক্ষমতাসম্পন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তথ্য রয়েছে। তার দাবি, আন্তর্জাতিক পরীক্ষানিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়টি গোপন রাখতে চীনা সামরিক বাহিনী পরীক্ষার চিহ্ন আড়াল করার কৌশল ব্যবহার করেছে। ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমাতে ‘ডিকাপলিং’ পদ্ধতিও নাকি ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২০ সালের ২২ জুন এমন একটি বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল।

চীনের প্রতিক্রিয়া
চীনের নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক রাষ্ট্রদূত শেন জিয়ান সরাসরি অভিযোগের জবাব না দিয়ে বলেন, পারমাণবিক ইস্যুতে বেইজিং সবসময় দায়িত্বশীল ও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে ‘চীনকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করে তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, অস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।
নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান ও নতুন অনিশ্চয়তা
২০১০ সালের নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার ফলে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনে কোনো বাধ্যতামূলক সীমা রইল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির পরিবর্তে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন সমঝোতার কথা বলেছেন। ডিন্যানোর ভাষায়, একাধিক পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মুখোমুখি বর্তমান বিশ্বে কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আর যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেড সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে চীন জানিয়েছে, এই পর্যায়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন আলোচনায় অংশ নেবে না। বেইজিংয়ের দাবি, তাদের ওয়ারহেড সংখ্যা প্রায় ৬০০, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রত্যেকের কাছে প্রায় চার হাজার করে রয়েছে।

বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো অস্ত্রনিয়ন্ত্রণে শূন্যতা তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা ভুল হিসাব বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখছেন। পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই নিজেদের অস্ত্রভান্ডার বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে, বিশেষত যখন চীন দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ চায়, তবে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। ক্রেমলিন জানিয়েছে, আবুধাবিতে সাম্প্রতিক আলোচনায় দুই দেশই দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। রাশিয়া চাইছে, ন্যাটো মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতাও আলোচনায় আসুক, যদিও দেশ দুটি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
নতুন চুক্তি নিয়ে জটিলতা

ব্রিটেন বলেছে, এখন এমন এক নতুন যুগের প্রয়োজন যেখানে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সবাই অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ আলোচনায় অংশ নেবে। ফ্রান্সও বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে, কারণ বৈশ্বিক পারমাণবিক নিয়ম দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নতুন চুক্তি করা অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। রাশিয়া নতুন ধরনের অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন করছে, যেমন বুরেভেস্টনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও পোসেইডন পানির নিচের টর্পেডো। অন্যদিকে ট্রাম্প মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তি করতে বহু বছর লেগে যেতে পারে, ফলে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক উত্তেজনার সময়ে অস্ত্রনিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ শূন্যতা তৈরি হবে।
পারমাণবিক ক্লাবে নতুন সদস্যের বিতর্ক
এই অনিশ্চয়তা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















