শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা বা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া চার তরুণকে প্রথমে আট সপ্তাহের শারীরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। এরপর শুরু হয় নয় সপ্তাহের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ। কঠোর এই সময়ে মাঠপর্যায়ের অনুশীলন, দীর্ঘ পদযাত্রা, অস্ত্রচালনা ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে তারা ধীরে ধীরে সাধারণ নাগরিক থেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিক হয়ে ওঠে।
কঠিনতম অভিজ্ঞতা: ফিল্ড ক্যাম্প
প্রশিক্ষণের প্রথম কয়েক সপ্তাহ শেষে আসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ধাপ—পাঁচ দিন চার রাতের ফিল্ড ক্যাম্প। জঙ্গলের ভেতর এই সময়ে নেই বিছানা, বিদ্যুৎ বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ। ঘাম, কাদা আর ক্লান্তির মাঝেও গোসলের সুযোগ না থাকায় ভেজা টিস্যু বা জীবাণুনাশক পাউডারই ভরসা।
এই পর্যায়ে প্রধান কাজগুলোর মধ্যে ছিল মাটিতে আশ্রয়গর্ত খোঁড়া, লক্ষ্যভেদে অগ্রসর হওয়া বা পিছু হটার কৌশল শেখা এবং চাপের মধ্যে নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য কৃত্রিম মিশন সম্পন্ন করা। প্রচণ্ড গরমে ভারী মাটি খুঁড়তে গিয়ে কেউ কেউ আহতও হয়েছে। তবু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই ছিল লক্ষ্য।

শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক লড়াই
তৃতীয় দিনে এসে ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। টানা কয়েক দিন গোসল না করা, মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে চলা এবং ঘুমের অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবু বিশ্রাম ও খাবারের পর আবার শক্তি ফিরে পেয়ে অনুশীলন চালিয়ে যায় তারা।
অস্বস্তির মধ্য দিয়ে সহনশীলতা শেখা
ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রশিক্ষণার্থীদের অস্বস্তিকর পরিবেশে রাখা হয়, যাতে তাদের সহনশীলতা বাড়ে। অস্থায়ী আশ্রয় বানিয়ে সেখানে রাত কাটানো, অস্ত্র সব সময় সঙ্গে রাখা এবং প্রস্তুত খাবার খেয়ে দিন পার করা—এসব অভিজ্ঞতা তাদের বাস্তব পরিস্থিতির জন্য তৈরি করে। একই সঙ্গে দেশরক্ষা ও পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্বের কথাও বারবার স্মরণ করিয়ে দেন প্রশিক্ষকরা।
পরিবারের চিঠিতে নতুন শক্তি

ফিল্ড ক্যাম্পের মাঝপথে বাড়ি থেকে পাওয়া চিঠি অনেকের চোখে জল এনে দেয়। মায়ের উৎসাহ, বাবার গর্ব কিংবা ভাইবোনের ভালোবাসা—এসব স্মৃতি তাদের মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলে। দূরে থাকলেও পরিবারের সমর্থন যে সবচেয়ে বড় শক্তি, তা তারা গভীরভাবে অনুভব করে।
অস্ত্রচালনা থেকে ২৪ কিলোমিটার পদযাত্রা
মৌলিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তারা শেখে অস্ত্র ব্যবহার, যুদ্ধকৌশল ও শৃঙ্খলা। সরাসরি গুলি চালানোর অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে ছিল রোমাঞ্চকর ও দায়িত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সবশেষে আসে ২৪ কিলোমিটারের গ্র্যাজুয়েশন পদযাত্রা—ভারী সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম। ক্লান্তি, ব্যথা আর ঘুমের সঙ্গে লড়াই করেও তারা গন্তব্যে পৌঁছায়। এই সাফল্য তাদের মধ্যে গর্ব ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।

শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক রূপান্তর
নয় সপ্তাহ শেষে কারও ওজন কমেছে, কারও শরীর আরও শক্ত হয়েছে, সবাই হয়েছে বেশি ফিট। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। তারা হয়েছে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ, সহনশীল এবং পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর
প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে কাটানো সময় এখন তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। আগে ভোরে উঠতে না চাওয়া তরুণ এখন পরিবারের জন্য নাশতা তৈরি করে। কেউ নিয়মিত মায়ের সঙ্গে সময় কাটায়, কেউ বাবার সঙ্গে বাজারে যায়, কেউ ভাইকে খেলাধুলার ক্লাসে পৌঁছে দেয়। কঠিন সময়ে পরিবারই সবচেয়ে বড় আশ্রয়—এই উপলব্ধি তাদের জীবনদৃষ্টিই বদলে দিয়েছে।

নতুন অধ্যায়ের শুরু
২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর চার তরুণই জাতীয় সেবার পরবর্তী ধাপে যোগ দিয়েছে। কেউ বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, কেউ নিরাপত্তা দায়িত্বে—নতুন পথচলা শুরু হলেও কঠোর এই নয় সপ্তাহের অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের ভিত্তি হয়ে থাকবে।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















