প্রায় দুই দশকের নীরবতার পর আবারও রঙে ভরে উঠেছে লাহোরের আকাশ। ছাদে ছাদে মানুষের ভিড়, হাসির শব্দ আর উড়ন্ত ঘুড়ির প্রতিযোগিতায় ফিরে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত বসন্ত উৎসব। ফেব্রুয়ারির ছয় থেকে আট তারিখ পর্যন্ত বিশেষ আয়োজন ঘিরে শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে আনন্দের আবহ, যেন স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এক পুরোনো সময় আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
উৎসবের আবেগে ফিরল শহরের প্রাণ
বসন্ত কেবল ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন নয়, এটি মানুষের ভেতরে বহন করা এক অনুভূতি। প্রতিবেশী থেকে পরিবার—সবাইকে এক ছাদের নিচে এনে দেয় এই উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা পাকিস্তানিরাও এই সময় দেশে ফেরেন, কারণ বসন্ত তাদের শৈশব, সম্পর্ক আর পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
শীতের বিকেলে ঠান্ডা আঙুলে সুতো ধরা, প্রতিদ্বন্দ্বী ঘুড়ি কেটে গেলে ছাদজুড়ে উল্লাস—এই অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। পুরোনো লাহোরে যেমন প্রতিটি শিশুই ঘুড়ি ওড়ানো শিখত স্বতঃস্ফূর্তভাবে, ঠিক তেমনই বসন্ত ছিল শহরের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ।

নিষেধাজ্ঞার পরও হারায়নি সংস্কৃতির টান
উৎসব বন্ধ থাকলেও মানুষের হৃদয় থেকে বসন্ত মুছে যায়নি। নিষেধাজ্ঞা শুধু আকাশ থেকে ঘুড়ি সরায়নি, কেড়ে নিয়েছিল পারিবারিক মিলন, সামাজিক আনন্দ আর শহরের সম্মিলিত উদযাপন। বসন্ত এমন এক উৎসব, যা ধনী-গরিব, তরুণ-বৃদ্ধ কিংবা দেশি-প্রবাসী—সব বিভাজন ভুলিয়ে সবাইকে একই আকাশের দিকে তাকাতে শেখায়।
এই পুনরুজ্জীবন তাই রাজনৈতিক নয়, বরং আবেগের। দায়িত্বশীলভাবে সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শহরের পরিচয় পুনর্গঠনের পথ খুলে দিয়েছে।
রঙ, স্বাদ আর স্মৃতির মিলনমেলা
ঈদের মতোই আনন্দঘন এই উৎসব শহরকে রঙে রাঙিয়ে তোলে। রঙিন পোশাক, উড়ন্ত ওড়না, সেজে ওঠা বাজার আর ঘরে ঘরে তৈরি পাকোড়া, জিলাপি, গজক ও ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ—সব মিলিয়ে বসন্ত হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ আনন্দের নাম।
ঘুড়ি আবার আকাশে উঠতেই জেগে ওঠে স্মৃতি—বাবার কাছ থেকে শেখা প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো, মায়ের সতর্ক ডাক, আর রঙিন মানুষের ভিড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক শহর। বসন্ত মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য কখনও মরে না; সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে, তারপর আবার উড়ে যায় আকাশ ছুঁতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















