ইরানে বিক্ষোভ কার্যত থেমে গেলেও সরকারের প্রতিশোধমূলক অভিযান এখনো তীব্র আকারে চলছে। আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জনপ্রিয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সম্পদ জব্দ করা হচ্ছে এবং সমালোচনামূলক গণমাধ্যম স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে—সবকিছুই নতুন করে অস্থিরতা ঠেকাতে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি নিহতদের জানাজা বা শোকানুষ্ঠানেও প্রকাশ্যে কান্না না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পরিবারগুলোকে।
ব্যাপক গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতির পরিবেশ
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারণা, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং টেলিভিশনে প্রচারিত স্বীকারোক্তির অনেকগুলোই জোরপূর্বক নেওয়া বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এত বিস্তৃত দমননীতি আগে দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিক সংকট ও সম্ভাব্য বৈদেশিক হামলার আশঙ্কা সরকারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত—এমন সংকেতই দিচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। সরকারি হিসেবে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিকিৎসক ও সহায়তাকারীদের নিশানা
বিক্ষোভ দমনের কয়েক সপ্তাহ পরও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। গোপনে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে চিকিৎসক, নার্স ও দন্তচিকিৎসকদের আটক করা হয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসকের অবস্থান এখনো অজানা বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাজনিত ভয়ের কারণে সংশ্লিষ্টরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

প্রতীকী ব্যবসা বন্ধ ও সম্পদ জব্দ
দেশজুড়ে জনপ্রিয় এক কফিশপ চেইনের মালিক ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ সমর্থনের অভিযোগে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের কথাও বলা হয়েছে। অনেক ইরানির কাছে এই পদক্ষেপ সাংস্কৃতিক প্রতীক ধ্বংসের মাধ্যমে বিরোধীদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা হিসেবে ধরা পড়েছে।
এদিকে বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়া ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা ও নির্মাতাদের বিরুদ্ধেও মামলা খোলা হয়েছে। সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়া একটি সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বিক্ষোভ ও হতাহতের খবর প্রকাশ করছিল।
শোকানুষ্ঠানেও নিয়ন্ত্রণ
নিহতদের পরিবারের ওপরও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। শোকানুষ্ঠানে কান্না না করা এবং নীরব থাকার অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।
নীরবতার ভেতরে ও প্রতিরোধের ইঙ্গিত
সরকার আপাতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে নাগরিক সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি দমন-পীড়নকে রাষ্ট্রীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন আবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, পরীক্ষা বর্জন এবং শোকানুষ্ঠানে কান্নার বদলে গান ও উদ্যাপনের মাধ্যমে প্রতিরোধের নতুন ভাষাও দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভয় ছড়িয়ে দিলেও অসন্তোষ পুরোপুরি নিভে যায়নি।
Sarakhon Report 


















