বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেও উৎপাদন অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেল উৎপাদক জোট ওপেক প্লাস। মার্চ মাসেও উৎপাদন না বাড়ানোর এই পদক্ষেপে নিকট ভবিষ্যতে ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও অপরিশোধিত তেলের দাম উঁচুতে থাকায় পাম্প পর্যায়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলছে না।
উৎপাদন স্থির রাখার কৌশল
জোটের লক্ষ্য একদিকে দামের তীব্র পতন ঠেকানো, অন্যদিকে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যাতে বড় আমদানিকারক অর্থনীতিগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি না বাড়ে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কুয়েত, ইরাক, আলজেরিয়া ও ওমানসহ আট প্রধান উৎপাদক দেশের এই সিদ্ধান্ত বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানকেই তুলে ধরেছে। দুর্বল চাহিদা পুনরুদ্ধার, সরবরাহ ব্যাঘাত এবং বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
তেলের দামে টানাপোড়েন
ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় সত্তর ডলারের আশপাশে ঘুরছে, যা সম্প্রতি ছয় মাসের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সূচক তেলও তুলনামূলক উঁচু দামে লেনদেন হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে বাজার এখনো আঁটসাঁট, তবে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকি নিয়েও সতর্কতা রয়েছে।
ভূরাজনীতি ও সরবরাহ ঝুঁকি
ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি কাজাখস্তানের বৃহৎ তেলক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কার্যক্রমগত সমস্যার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়াও স্বল্পমেয়াদে দামে সহায়তা দিয়েছে। যদিও ধীরে ধীরে উৎপাদন পুনরারম্ভ হচ্ছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের নিষেধাজ্ঞা ও উত্তেজনা বাজার মনোভাবকে প্রভাবিত করে চলেছে।
অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, জোট এখন ‘অপেক্ষা করে দেখার’ নীতি অনুসরণ করছে। মার্চের পরবর্তী উৎপাদন পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো আগাম দিকনির্দেশনা না থাকায় বোঝা যায়, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও চাহিদার গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখতে চায় তারা। একই সঙ্গে আগামী প্রান্তিকে জোটভুক্ত তেলের চাহিদা কমতে পারে—এমন পূর্বাভাসও উৎপাদন বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে আছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ
চাহিদা বৃদ্ধির গতি কমে গেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলসহ জোটের বাইরে উৎপাদন বাড়তে থাকলে ২০২৬ সালে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়লেও দামের ঊর্ধ্বগতি সীমিত থাকতে পারে।
ভোক্তা ও অর্থনীতির প্রভাব
বর্তমান দামের কাছাকাছি স্থিতিশীলতা উপসাগরীয় তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য রাজস্ব নিশ্চয়তা দিচ্ছে, আবার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কাও এড়াচ্ছে। ভোক্তাদের জন্যও আপাতত জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই থাকতে পারে, যদিও নতুন কোনো উত্তেজনা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিতে পারে।
আগামী বৈঠকের দিকে নজর
মার্চের প্রথম দিনে জোটের পরবর্তী বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। সেখানে প্রথম প্রান্তিকের পর উৎপাদন নীতি কী হবে, সে বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাজার। ততদিন পর্যন্ত উৎপাদন স্থির রাখার সিদ্ধান্ত তেলের দামকে সমর্থন দিলেও অস্থিরতার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















