দুবাইয়ে চীনা নববর্ষের ঘোড়ার বছর উদযাপনে এক্সপো সিটি হয়ে উঠেছিল রঙ, ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির মিলনমেলা। তিন হাজারের বেশি শিল্পী, প্রায় ৪০টি মার্চিং দল এবং দুবাই পুলিশের অশ্বারোহী ইউনিটের অংশগ্রহণে আয়োজিত হয় গ্র্যান্ড প্যারেড, যা শহরজুড়ে উদযাপনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে।
সাংস্কৃতিক ঐক্যের অনন্য প্রদর্শন
হ্যাপি চাইনিজ নিউ ইয়ার গ্র্যান্ড প্যারেডে দুবাই পুলিশের অশ্বারোহী ইউনিটের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এ বছর চীনা নববর্ষের সময় পবিত্র রমজান মাসের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় উৎসবটি পেয়েছে আলাদা তাৎপর্য। চীনা ও ইসলামি—দুই ঐতিহ্যেই ঘোড়া শক্তি, সামর্থ্য ও মর্যাদার প্রতীক। সেই প্রতীকী অর্থকে সামনে রেখে অশ্বারোহী পুলিশের উপস্থিতি দুই সংস্কৃতির পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের বার্তা তুলে ধরে।
শোভাযাত্রায় চীনা ঐতিহ্য ও আমিরাতি সংস্কৃতির সমন্বয়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। চোখ ধাঁধানো পরিবেশনা, সুসজ্জিত ফ্লোট এবং ঐতিহ্যবাহী উপস্থাপনায় দিনভর উৎসবমুখর আবহ বিরাজ করে।
আয়োজন ও লক্ষ্য
দুবাইয়ে চীনের কনস্যুলেট জেনারেল ও এক্সপো সিটি দুবাই যৌথভাবে এ আয়োজন করে। দুবাই ফেস্টিভ্যালস অ্যান্ড রিটেইল এস্টাবলিশমেন্ট (ডিএফআরই) সহযোগিতা দেয়। আয়োজকরা জানান, এই প্যারেড ছিল শহরব্যাপী চীনা নববর্ষ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, যা বহুসংস্কৃতির সহাবস্থান ও বৈচিত্র্য উদযাপনে দুবাইয়ের অঙ্গীকারকে আরও জোরালো করে।
‘কানেক্ট ফিউচার’ বার্তা ও তিন থিম জোন
এ বছরের শোভাযাত্রার প্রতীকী বার্তা ছিল ‘কানেক্ট ফিউচার’। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণে গড়ে তোলা হয় তিনটি থিমভিত্তিক জোন।
হেরিটেজ এক্সপেরিয়েন্স জোনে তুলে ধরা হয় চীনের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প। নিংশিয়া সূচিকর্ম, শিয়ামেনের ল্যাকার থ্রেড খোদাই, জিংদেজেনের পোর্সেলিন শিল্প দর্শকদের আকর্ষণ করে। পাশাপাশি ছিল ঐতিহ্যবাহী চা পরিবেশন, ক্যালিগ্রাফি কর্মশালা এবং হানফু পোশাক পরার অভিজ্ঞতা।
সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনোভেশন জোনে প্রদর্শিত হয় সমসাময়িক চীনা উদ্ভাবন। স্বয়ংচালিত যান, রোবট এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি নির্ভর ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিকে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সেতুবন্ধনের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে। একই সঙ্গে চীন-আরব সহযোগিতার সাফল্যও এখানে উপস্থাপিত হয়।
কালচারাল অ্যান্ড কুলিনারি জোনে চীনের বিভিন্ন প্রদেশের খাবারের স্বাদ উপভোগের সুযোগ ছিল। শিনজিয়াংয়ের বিশেষ পদ, ইউনান কফি এবং ইম্পেরিয়াল ফ্র্যাগরেন্স গার্ডেনের সাংস্কৃতিক পণ্য দর্শকদের জন্য তৈরি করে এক ভিন্ন স্বাদের যাত্রা।
দুবাইয়ের বৈশ্বিক পরিচয়ের প্রতিফলন
ডিএফআরইর প্রধান নির্বাহী আহমেদ আল খাজা বলেন, এই প্যারেড দুবাইয়ের বৈশ্বিক পরিচয়কে প্রতিফলিত করেছে—যেখানে ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানো হয় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় একত্রিত হয়। অশ্বারোহী পুলিশ থেকে হাজারো শিল্পী ও দর্শকের অংশগ্রহণ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের শক্তিকে সামনে এনেছে। তিনি জানান, এটি শহরজুড়ে ঘোড়ার বছর উপলক্ষে আয়োজিত বিস্তৃত কর্মসূচির সূচনা মাত্র।
২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে উদযাপন
গ্র্যান্ড প্যারেডের মাধ্যমে শুরু হওয়া ঘোড়ার বছরের উদযাপন ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। মল অব দ্য এমিরেটসে সমসাময়িক চীনা সংস্কৃতির নানা আয়োজন, দুবাইয়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বিশেষ আকর্ষণ, মিশেলিন তারকাখ্যাত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁয় বিশেষ ডাইনিং অভিজ্ঞতা এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ শপিং গন্তব্যে বিশেষ অফার রাখা হয়েছে।
দুবাইয়ে চীনা নববর্ষের গুরুত্ব
চীনা নববর্ষ ১৫ দিনের একটি বার্ষিক উৎসব, যা জানুয়ারি ২১ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০-এর মধ্যে উদিত নতুন চাঁদ দিয়ে শুরু হয়। দুবাইয়ে এটি এখন শহরব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরিবেশনা, খাবার, কেনাকাটা ও বিনোদনের বৃহৎ কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। দুবাই রিটেইল ক্যালেন্ডারের অংশ হিসেবে এই উৎসব শহরের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুসংস্কৃতির চরিত্রকে তুলে ধরে।
ঐতিহ্য ও বিশ্বস্বীকৃতি
চীনা জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসব স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল পরিবার পুনর্মিলন, পুরোনোকে বিদায় এবং নতুনকে স্বাগত জানানোর মূল্যবোধ বহন করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এটি শুধু চীনের নয়, সমগ্র মানবজাতির এক সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















