১০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
আত্মনির্ভরতার তরঙ্গ: আমেরিকায় সংখ্যালঘু উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপ বুম এশিয়ার করপোরেট শাসনে বিপ্লব: জাপানের পথচলা কি বদলে দেবে পুরো অঞ্চলের পুঁজিবাজার? তারেক রহমানের শপথে নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ পাঠানোর পরিকল্পনা বিএনপির ভোটে পরাজিত হলেও সংসদে যেতে পারেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাহুল গান্ধী ভারতের কটন চাষী ও টেক্সটাইল রফতানিকারীদের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ অভিযোগ আফ্রিকার জাগরণের নতুন পাঠ: উন্নয়নের পথে জনসংখ্যাই কি মোড় ঘোরাবে? তারেক রহমান জামায়াত আমির ও এনসিপি প্রধানের বাসায় যাচ্ছেন রোববার এই নির্বাচনটা একটু ব্যতিক্রম হয়ে গেছে: বললেন মির্জা আব্বাস বিএনপির বিজয়ের পর তারেক রহমান বললেন ‘আমরা স্বাধীন’, জনগণকে শুভেচ্ছা ইইউ বাংলাদেশে নতুন সরকারের অধীনে সম্পর্ক গভীর করার লক্ষ্যে আগ্রহী

আফ্রিকার জাগরণের নতুন পাঠ: উন্নয়নের পথে জনসংখ্যাই কি মোড় ঘোরাবে?

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে বহু অঞ্চলে, কিন্তু আফ্রিকা এগোচ্ছে উল্টো স্রোতে। প্রতি দশকে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ যোগ হচ্ছে এই মহাদেশে। ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ কোটিতে, যা হবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। এই বাস্তবতায় আফ্রিকা শুধু শ্রমবাজার নয়, ভোক্তা, সংস্কৃতি ও নতুন চিন্তার উৎস হিসেবেও বড় শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
 
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ লেখক Joe Studwell-এর নতুন বই How Africa Works আফ্রিকার উন্নয়ন নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এনেছে।
 
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও দারিদ্র্যের শেকড়
 
আফ্রিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ বাস করে। কেন এমন? লেখকের মতে, এর পেছনে রয়েছে ‘স্বল্প ব্যয়ের ঔপনিবেশিকতা’। ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকা থেকে কাঁচামাল নিয়ে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে খুব সীমিত শিক্ষিত শ্রেণি। পাশাপাশি কৃত্রিম সীমান্ত টেনে তৈরি করেছে বহু জাতিগতভাবে বিভক্ত রাষ্ট্র। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি গড়ে ওঠেনি শক্ত ভিত্তির ওপর।
 
তবে এখানেই থেমে থাকেননি লেখক। তিনি আরও এক নতুন যুক্তি সামনে এনেছেন।
 
জনসংখ্যার ঘনত্বই কি আসল চাবিকাঠি
 
লেখকের মতে, আফ্রিকার দীর্ঘদিনের অনুন্নয়নের একটি বড় কারণ ছিল কম জনঘনত্ব। এশিয়া যখন অর্থনৈতিক উত্থান শুরু করে, তখন সেখানে ছিল জনবহুল সমাজ ও জমির স্বল্পতা। কিন্তু আফ্রিকায় রোগব্যাধি, দাসপ্রথা, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ ও অনুর্বর মাটির কারণে জনসংখ্যা ঘনত্ব অনেক দিন কম ছিল।
 
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার জনঘনত্ব ছিল ইউরোপের ১৫০০ সালের সমপর্যায়ের। লেখকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনঘনত্ব দাঁড়াবে ১৯৬০ সালের এশিয়ার সমতুল্য পর্যায়ে। তার দাবি, এখনই আফ্রিকা সেই পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যখন ঘন জনসংখ্যা শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়তে পারে।
 
যদিও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলেন, মাথাপিছু আয় ও জনঘনত্বের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক সবসময় দেখা যায় না। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ Burundi ও Malawi এখনও দরিদ্র। তবু লেখকের যুক্তি হলো, বাজার সচল হতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমালোচনামূলক ভর প্রয়োজন।
 
আশার চার উদাহরণ
 
আফ্রিকার ৫৪ দেশের মধ্যে অন্তত চারটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। Botswana ও Rwanda-এর সাফল্য আগেই আলোচিত ছিল। তবে Mauritius ও Ethiopia-র অগ্রযাত্রাও এখন নজর কাড়ছে।
 
এই দেশগুলোর ক্ষেত্রে লেখক দেখিয়েছেন, জাতিগত বিভাজন পেরিয়ে একটি ‘উন্নয়নমুখী জোট’ গড়ে উঠেছে। যা রাজনৈতিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা এনেছে।
 
এশিয়ার মডেল কি আফ্রিকার পথ
 
এর আগে লেখক How Asia Works বইয়ে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পারিবারিক কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক নীতির সমন্বয়ে এশিয়া দারিদ্র্য কাটিয়েছে। তার মতে, একই মডেল আফ্রিকার জন্যও কার্যকর হতে পারে।
 
তবে সমালোচকরা বলছেন, আফ্রিকার বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণ সুদান কখনও দক্ষিণ কোরিয়া হবে না—এমন তুলনাও টানা হচ্ছে। অনেকের মতে, আফ্রিকার রাজনৈতিক দুর্নীতি ও দায়হীন নেতৃত্বই উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
 
২০২৬: পরিবর্তনের ইঙ্গিত
 
তবু সময় বদলাচ্ছে। ২০২৬ সালে আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীনের অর্থনীতি ধীরগতির, অন্যদিকে পণ্যমূল্য বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আফ্রিকাকে এখন দাতব্য নয়, বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেখছেন।
 
সবচেয়ে বড় বিষয়, বেকার তরুণদের চাপে আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বও বুঝতে শুরু করেছে যে টিকে থাকতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জরুরি। টিকে থাকার তাগিদই হতে পারে উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রণোদনা।
জনপ্রিয় সংবাদ

আত্মনির্ভরতার তরঙ্গ: আমেরিকায় সংখ্যালঘু উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপ বুম

আফ্রিকার জাগরণের নতুন পাঠ: উন্নয়নের পথে জনসংখ্যাই কি মোড় ঘোরাবে?

০৮:২৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে বহু অঞ্চলে, কিন্তু আফ্রিকা এগোচ্ছে উল্টো স্রোতে। প্রতি দশকে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ যোগ হচ্ছে এই মহাদেশে। ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ কোটিতে, যা হবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। এই বাস্তবতায় আফ্রিকা শুধু শ্রমবাজার নয়, ভোক্তা, সংস্কৃতি ও নতুন চিন্তার উৎস হিসেবেও বড় শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
 
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ লেখক Joe Studwell-এর নতুন বই How Africa Works আফ্রিকার উন্নয়ন নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এনেছে।
 
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও দারিদ্র্যের শেকড়
 
আফ্রিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ বাস করে। কেন এমন? লেখকের মতে, এর পেছনে রয়েছে ‘স্বল্প ব্যয়ের ঔপনিবেশিকতা’। ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকা থেকে কাঁচামাল নিয়ে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে খুব সীমিত শিক্ষিত শ্রেণি। পাশাপাশি কৃত্রিম সীমান্ত টেনে তৈরি করেছে বহু জাতিগতভাবে বিভক্ত রাষ্ট্র। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি গড়ে ওঠেনি শক্ত ভিত্তির ওপর।
 
তবে এখানেই থেমে থাকেননি লেখক। তিনি আরও এক নতুন যুক্তি সামনে এনেছেন।
 
জনসংখ্যার ঘনত্বই কি আসল চাবিকাঠি
 
লেখকের মতে, আফ্রিকার দীর্ঘদিনের অনুন্নয়নের একটি বড় কারণ ছিল কম জনঘনত্ব। এশিয়া যখন অর্থনৈতিক উত্থান শুরু করে, তখন সেখানে ছিল জনবহুল সমাজ ও জমির স্বল্পতা। কিন্তু আফ্রিকায় রোগব্যাধি, দাসপ্রথা, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ ও অনুর্বর মাটির কারণে জনসংখ্যা ঘনত্ব অনেক দিন কম ছিল।
 
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার জনঘনত্ব ছিল ইউরোপের ১৫০০ সালের সমপর্যায়ের। লেখকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনঘনত্ব দাঁড়াবে ১৯৬০ সালের এশিয়ার সমতুল্য পর্যায়ে। তার দাবি, এখনই আফ্রিকা সেই পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যখন ঘন জনসংখ্যা শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়তে পারে।
 
যদিও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলেন, মাথাপিছু আয় ও জনঘনত্বের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক সবসময় দেখা যায় না। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ Burundi ও Malawi এখনও দরিদ্র। তবু লেখকের যুক্তি হলো, বাজার সচল হতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমালোচনামূলক ভর প্রয়োজন।
 
আশার চার উদাহরণ
 
আফ্রিকার ৫৪ দেশের মধ্যে অন্তত চারটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। Botswana ও Rwanda-এর সাফল্য আগেই আলোচিত ছিল। তবে Mauritius ও Ethiopia-র অগ্রযাত্রাও এখন নজর কাড়ছে।
 
এই দেশগুলোর ক্ষেত্রে লেখক দেখিয়েছেন, জাতিগত বিভাজন পেরিয়ে একটি ‘উন্নয়নমুখী জোট’ গড়ে উঠেছে। যা রাজনৈতিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা এনেছে।
 
এশিয়ার মডেল কি আফ্রিকার পথ
 
এর আগে লেখক How Asia Works বইয়ে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পারিবারিক কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক নীতির সমন্বয়ে এশিয়া দারিদ্র্য কাটিয়েছে। তার মতে, একই মডেল আফ্রিকার জন্যও কার্যকর হতে পারে।
 
তবে সমালোচকরা বলছেন, আফ্রিকার বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণ সুদান কখনও দক্ষিণ কোরিয়া হবে না—এমন তুলনাও টানা হচ্ছে। অনেকের মতে, আফ্রিকার রাজনৈতিক দুর্নীতি ও দায়হীন নেতৃত্বই উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
 
২০২৬: পরিবর্তনের ইঙ্গিত
 
তবু সময় বদলাচ্ছে। ২০২৬ সালে আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীনের অর্থনীতি ধীরগতির, অন্যদিকে পণ্যমূল্য বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আফ্রিকাকে এখন দাতব্য নয়, বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেখছেন।
 
সবচেয়ে বড় বিষয়, বেকার তরুণদের চাপে আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বও বুঝতে শুরু করেছে যে টিকে থাকতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জরুরি। টিকে থাকার তাগিদই হতে পারে উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রণোদনা।