সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রাস্তায় নামলেই মোবাইলে পৌঁছে যাচ্ছে সতর্কবার্তা। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে আন্দোলন শুরু হতেই অনেকের ফোনে আসে বার্তা—তাদের “অবৈধ সমাবেশে উপস্থিতি” নথিভুক্ত হয়েছে এবং তারা গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন। ভবিষ্যতে এমন জমায়েতে না যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
মানবাধিকার কর্মী ও গবেষকদের মতে, মোবাইলের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করেই বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক আন্দোলন দমনে ইরান যে বিশাল ডিজিটাল নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলেছে, সেটিই এখন প্রধান অস্ত্র।
মোবাইল, ইন্টারনেট আর মুখাবয়ব শনাক্তকরণে কড়া নজর
গবেষণা বলছে, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর ভেতরেই যুক্ত করা হয়েছে নজরদারির প্রযুক্তি। মোবাইল ডিভাইস, বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার, এমনকি ওয়েব ব্রাউজিংয়ের ওপরও রাখা হচ্ছে নজর। এর সঙ্গে আছে মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার বিস্তৃত ব্যবহার।
গত মাসে সহিংস দমন অভিযানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলেও, পরে আংশিক সংযোগ চালু হওয়ার পর শুরু হয় টার্গেট ধরে আটক। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ফোনের তথ্য ও ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি।
সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট, তারপর সিম বন্ধ
ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যারা আন্দোলন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, তাদের অনেকের সিম কার্ড সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ সতর্কবার্তা পেয়েছেন ফোনে। আবার কারও ব্যাংকিং সেবাতেও বিঘ্ন ঘটেছে।
এক গবেষকের ভাষ্য, সরকার একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করছে। বিক্ষোভে যারা ছিলেন বলে সন্দেহ, তাদের নাম সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে এক বা দুই মাস পরও তাদের বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।
২০১৩ থেকে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের ভিত
ইরান প্রায় ২০১৩ সাল থেকে নিজস্ব জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যাতে ইন্টারনেট সহজে নিয়ন্ত্রণ ও ফিল্টার করা যায়। ধীরে ধীরে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয় নজরদারির নতুন নতুন উপায়।
দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারে আরোপ করা হয় নিয়ন্ত্রণ। কিছু সেবা আংশিক খোলা থাকলেও বহু আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক সংকটের সময় পুরো ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যাতে তথ্য ছড়িয়ে না পড়ে।
বিকল্প পথে নজর এড়ানোর চেষ্টা, তাতেও ঝুঁকি
অনেক ইরানি বিকল্প স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এমন সেবা ব্যবহার করলেও গ্রেপ্তার বা কঠোর শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
২০১৮ সালের পর থেকে লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি, যোগাযোগে আড়িপাতা এবং ডিভাইসে গোপন সফটওয়্যার প্রবেশ করানোর মতো কৌশলও যুক্ত হয়েছে। ফোনে স্পাইওয়্যার ঢুকিয়ে ব্যক্তিগত বার্তা, নথি ও তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল পরিচয় আর আচরণের সংযোগ
২০১৯ সালের দিকে নাগরিকদের কেন্দ্রীভূত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে ডিজিটাল আচরণ যুক্ত থাকে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য সিম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ায় কার চলাফেরা, কার সঙ্গে যোগাযোগ, কোন অ্যাপ ব্যবহার—সবকিছু অনুসরণ করা সহজ হয়েছে।
আরেকটি কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আচরণ নথিভুক্ত করা, গতিবিধি ট্র্যাক করা এবং প্রয়োজনে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে দেশীয় সেবায় আনায় নজরদারি আরও সহজ হয়েছে।
নারীদের ওপর প্রযুক্তিভিত্তিক চাপ
ইসফাহান শহরে হিজাব না পরা নারীদের শনাক্ত করতে বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করেছে পুলিশ। ফোন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিভাইস শনাক্তকরণ নম্বর সংগ্রহ করে তা টেলিকম তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে তথ্য পড়ে নেওয়ার যন্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। পরে অনেক নারী সতর্কবার্তা পেয়েছেন পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের নজরদারি কাঠামো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাস্তায় উপস্থিতি থেকে শুরু করে অনলাইন মন্তব্য—সবকিছুই রাষ্ট্রের নজরে চলে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















