সিঙ্গাপুরে অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। ২০২৮ সালের মধ্যে সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ড বা Central Provident Fund সদস্যদের জন্য চালু হতে যাচ্ছে একটি নতুন বিনিয়োগ স্কিম। সরকারের আশা, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সদস্যদের অবসর সঞ্চয় আরও কার্যকরভাবে বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিকল্পনা সবার জন্য উপযোগী নাও হতে পারে।
বাজেট ভাষণে ঘোষণা
২০২৬ সালের বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী Lawrence Wong জানান, উচ্চ ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ও সক্ষম সদস্যদের জন্য নতুন বিনিয়োগ স্কিম আনা হবে। লক্ষ্য হচ্ছে কর্মজীবনের পুরো সময়জুড়ে তুলনামূলক বেশি মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।
সরকার জানিয়েছে, যারা বেশি রিটার্ন চান এবং বাজারের ওঠানামা সহ্য করতে প্রস্তুত, তারাই এই স্কিম থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন।
বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে সিপিএফের অধীনে রয়েছে CPF Investment Scheme। এই স্কিমে ৭০০-রও বেশি বিনিয়োগ পণ্য রয়েছে। কিন্তু এত বিকল্প অনেক সদস্যের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। মনোবিজ্ঞানী Barry Schwartz তাঁর “প্যারাডক্স অব চয়েস” তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত বিকল্প অনেক সময় ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কঠিন করে তোলে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৯১ হাজার সিপিএফআইএস-ওএ বিনিয়োগকারী বছরে ২.৫ শতাংশের বেশি রিটার্ন পেয়েছেন, যা অর্ডিনারি অ্যাকাউন্টের সুদের হারের চেয়ে বেশি। কিন্তু একই সময়ে ১ লাখ ৯২ হাজার বিনিয়োগকারী ২.৫ শতাংশের কম রিটার্ন পেয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এখন আর সক্রিয় বিনিয়োগকারী নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই রিটার্নের পার্থক্য সম্পদের বৈষম্য বাড়াতে পারে। কর্মজীবনের শুরুতে খারাপ ফল পেলে কেউ পিছিয়ে পড়তে পারেন, আর কেউ ভাগ্য বা দক্ষতার জোরে এগিয়ে যেতে পারেন।
নতুন স্কিমের কাঠামো: জীবনচক্রভিত্তিক পদ্ধতি

নতুন স্কিমটি জীবনচক্রভিত্তিক বিনিয়োগ মডেলের ওপর দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ তরুণ সদস্যদের জন্য পোর্টফোলিওতে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু উচ্চ রিটার্নের সম্পদ, যেমন শেয়ার ও পণ্যভিত্তিক বিনিয়োগ, বেশি থাকবে।
ধরা যাক, ৩৫ বছর বয়সী একজন সদস্যের সামনে অবসর পর্যন্ত আরও ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় আছে। তিনি চাইলে নতুন স্কিমের আওতায় এমন একটি তহবিল বেছে নিতে পারবেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি সামাল দিতে শেয়ারবাজারমুখী বিনিয়োগ থাকবে।
অবসরের বয়স ঘনিয়ে এলে পোর্টফোলিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম ঝুঁকির সম্পদে স্থানান্তরিত হবে। ফলে সদস্যকে আলাদা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে, এমনকি মন্দার সময়ও ধাপে ধাপে বিনিয়োগ চালু থাকবে।
কারা উপকৃত হতে পারেন
যেসব সদস্য ইতিমধ্যে পূর্ণ অবসর তহবিল জমা করেছেন এবং অন্য স্থিতিশীল আয়ের উৎস রয়েছে, তাঁদের জন্যও এই স্কিম উপযোগী হতে পারে। একইভাবে, যারা বর্তমানে সিপিএফআইএসে সক্রিয় কিন্তু কম খরচে ও কম ঝামেলায় বিনিয়োগ করতে চান, তারাও নতুন স্কিমে যেতে পারেন।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ ৩০ হাজার সদস্য সিপিএফআইএস-ওএ এবং ৯ লাখ ৮০ হাজার সদস্য সিপিএফআইএস-এসএ-তে বিনিয়োগের যোগ্য ছিলেন।
তবে ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
সিপিএফের সাধারণ সঞ্চয়ে একটি ন্যূনতম সুদের হার নিশ্চিত থাকে, যা বাজার মন্দার সময়ও বজায় থাকে। কিন্তু নতুন স্কিমে গেলে সদস্যদের ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ থেকে বাজারভিত্তিক সম্পদে স্থানান্তরিত হতে হবে। ফলে বিনিয়োগের মূল্য ওঠানামা করবে।
যাঁদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা কম বা সঞ্চয়ের কোনো ক্ষতি মেনে নেওয়া কঠিন, তাঁদের জন্য এই স্কিম উপযুক্ত নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
আর্থিক পরিকল্পনার সহায়তা
সরকার জানিয়েছে, নতুন স্কিম চালুর সময় সদস্যদের স্বাধীন আর্থিক পরামর্শের সুযোগ দেওয়া হবে। কার জন্য স্কিমটি উপযুক্ত, তা কেবল বয়স বা সিপিএফ ব্যালান্স দেখে নয়; বরং সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা হবে।

প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ
এই স্কিম আনার ধারণা প্রথম আসে ২০১৬ সালের আগস্টে সিপিএফ উপদেষ্টা প্যানেলের সুপারিশ থেকে। লক্ষ্য ছিল সহজ ও কম খরচের একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ডিজিটাল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম বা তথাকথিত রোবো-অ্যাডভাইজারের প্রসার এখন এই উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। কম খরচে ব্যক্তিগতকৃত পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা সম্ভব হওয়ায় সরকার মনে করছে, এবার এই নতুন পথচলা শুরু করার সময় এসেছে।
দীর্ঘ বিনিয়োগ সময়সীমা ও ধাপে ধাপে ঝুঁকি কমানোর কৌশল নিয়ে নতুন স্কিমটি যেন অবসর সঞ্চয়ের আকাশে এক নতুন উড়ান। তবে এই উড়ানে ওঠার আগে প্রত্যেক সদস্যকেই ভাবতে হবে—তাঁর ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কতটা, আর দীর্ঘমেয়াদে কোন পথ তাঁর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















