ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩৩ বছর বয়সী জিম প্রশিক্ষক আলী রাহবারের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এটি ছিল হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। যদিও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও ঘটনাটি দেশজুড়ে দমনপীড়ন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
মাশহাদে গ্রেপ্তার, দুই সপ্তাহ পর লাশ
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির ৮ তারিখে মাশহাদ শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় নিরাপত্তা বাহিনী আলী রাহবারকে আটক করে। এরপর দুই সপ্তাহ পরিবার তার কোনো খোঁজ পায়নি। হঠাৎ একদিন কর্তৃপক্ষ থেকে ফোন আসে, জানানো হয় মরদেহ নিয়ে যেতে।
স্বজনদের দাবি, গ্রেপ্তারের পর তার সঙ্গে কোনো আইনজীবীর দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, কোনো আদালতে তোলা হয়নি, এমনকি আনুষ্ঠানিক কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার কথাও জানানো হয়নি। ইউরোপে থাকা এক চাচাতো ভাই বলেন, কোনো আদালত, কোনো বিচার, কিছুই হয়নি—সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
সরকারের অস্বীকার, তালিকায় নাম
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রকাশ্যে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। বিচার বিভাগের সরকারি গণমাধ্যমেও রাহবারের মৃত্যুর খবরকে ভুয়া বলে দাবি করা হয়।
তবে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যে প্রায় তিন হাজার নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছেন, সেখানে আলী রাহবারের নাম রয়েছে। যদিও তালিকায় মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
দাফনে কড়া নজরদারি, চল্লিশা পালনেও বাধা
পরিবারের দাবি, জানুয়ারির ২২ তারিখে সীমিত পরিসরে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করতে হয়। পুরো অনুষ্ঠান ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে। এমনকি মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্তিতে শোকানুষ্ঠান না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে স্বজনদের অভিযোগ।
রাহবারের এক আত্মীয় জানান, মরদেহের কাফন খুলে দেখার অনুমতিও পরিবার পায়নি। শুধু তার মা মুখ দেখতে পেরেছিলেন।

নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্তে মানবাধিকার সংস্থা
কিছু মানবাধিকার সংস্থার দাবি, রাহবারকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি, বরং নির্যাতনের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। যদিও এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক দমন অভিযানে জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও হেফাজতে নির্যাতনের বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত চিত্র সামনে এসেছে। বিভিন্ন পরিবার অভিযোগ করেছে, আটক স্বজনদের মৃত্যুদণ্ডের কথা জানানো হয়েছে, অথচ কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার খবর তারা পায়নি। এটি আনুষ্ঠানিক রায়, নাকি ভয় দেখানোর কৌশল—তা স্পষ্ট নয়।
দমননীতির পুরোনো ধারা
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অতীতেও বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ড বা তার হুমকি ব্যবহার করেছে ইরান। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার শেষ করে সীমিত সুযোগে সাজা কার্যকর করা হয়েছে।
আলী রাহবারের ঘটনায় কোনো আইনি প্রক্রিয়ার প্রমাণই পাওয়া যায়নি বলে দাবি তদন্তকারীদের। একই ধরনের আরও কয়েকটি সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনাও তারা খতিয়ে দেখছে।

স্বপ্ন ছিল বাঁচার
পরিবার জানায়, আলী রাহবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না হলেও দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে হতাশ ছিলেন। তিনি মনে করতেন, তার প্রজন্ম বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে, ভবিষ্যৎ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
এক আত্মীয়ের ভাষায়, তিনি জানতেন ঝুঁকি আছে। তবু বলতেন, শুধু দেশের জন্য নয়, নিজের জন্যও তিনি বাঁচতে চান। পৃথিবীর অন্য মানুষের মতো জীবন উপভোগ করতে চান।
এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং ইরানে চলমান দমননীতির মধ্যে জবাবদিহির সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে—যেখানে অভিযোগ উঠছে, বিচার ছাড়াই মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















