০৮:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

গত তিন দশক ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে অনেকেই একটি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বের গল্প হিসেবে দেখেছেন। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে দুই দেশের মধ্যে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল, তা বহু পর্যবেক্ষকের কাছে এক ধরনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’-এর রূপ নিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা কখনো স্থির থাকে না। শক্তির ভারসাম্য বদলায়, অগ্রাধিকার বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মূল্যায়নও।

আজ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের প্রত্যাশা খুব বেশি বদলায়নি, কিন্তু আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়েছিল কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণে। চীনের উত্থানের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত ভারসাম্য, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা, মার্কিন বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদের সুযোগ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—এসবই ছিল ভারতের প্রধান স্বার্থ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত দেখেছে এমন একটি শক্তি হিসেবে, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেশটির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রেরও ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রায় একই রকম। ভারতকে দেখা হতো এশিয়ায় চীনের ভারসাম্য রক্ষাকারী সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে। পাশাপাশি এটি ছিল একটি বড় বাজার, বিনিয়োগের ক্ষেত্র, দক্ষ কর্মশক্তির উৎস এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সম্ভাব্য ক্রেতা। তবে এই সম্পর্ক কখনো আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ নেয়নি; বরং ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ নামের একটি নমনীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু সমস্যার শুরু হয়েছে তখন, যখন ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করে।

পরিবর্তিত ভূরাজনীতির প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিকে বোঝার জন্য ইউরেশিয়াকে একটি একক কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে দেখতে হয়। ইউরোপে রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা এবং পূর্ব এশিয়ায় চীনের উত্থান—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রে ছিল। একসময় মনে করা হয়েছিল, ভারত এই তিন ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখতে পারবে।

US-India relations at a crossroads - The Business Times

রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে ভারত হয়তো মস্কোর ওপর কিছু প্রভাব বিস্তার করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। আবার উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের গভীর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক তাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। আর চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ভারতকে দেখা হয়েছিল এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই ধারণাগুলোর অনেকটাকেই দুর্বল করে দিয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে এবং রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখে। ফলে ওয়াশিংটনের চোখে ভারত রাশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি। একইভাবে পশ্চিম এশিয়ার নানা কূটনৈতিক সমীকরণেও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ভারতকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে দেখেনি।

চীন প্রসঙ্গে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে চীনকে ঘিরে মার্কিন কৌশলে।

একসময় ধারণা ছিল, ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি চীনের শক্তির একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবধান কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।

অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাও সবসময় মার্কিন প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ভারত কখনোই প্রকাশ্য চীনবিরোধী সামরিক জোটের অংশ হতে আগ্রহী ছিল না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে, কিন্তু ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও স্বতন্ত্র থেকেছে।

এর পেছনে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত যুক্তি রয়েছে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর নীতি অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু একই নীতি ওয়াশিংটনের কাছে কখনো কখনো সীমাবদ্ধতা হিসেবেও প্রতীয়মান হয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার নতুন রূপ

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে প্রধানত সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। বাণিজ্য ঘাটতি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ—এসব ক্ষেত্র এখন মার্কিন নীতির কেন্দ্রে।

এই নতুন প্রতিযোগিতার ময়দানে ভারতের অবস্থান এখনও সীমিত। বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের বিকল্প হিসেবে ভারত কিছু অগ্রগতি করলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। একইভাবে উন্নত চিপ উৎপাদন, এআই অবকাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে ভারতকে ওয়াশিংটন অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করে না।

US-India Partnership: Crisis Management in the Pandemic Era and Future of the  Relationship | Vivekananda International Foundation

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের প্রকৃতি বদলে গেছে। ভারত আর এমন একটি দেশ নয়, যাকে শক্তিশালী করে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। বরং এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার, বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্রেতা—এই পরিচয়েই বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে।

নতুন যুগের কূটনীতি

এর অর্থ এই নয় যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। বরং সম্পর্কটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। আবেগ, প্রতীকী ঘনিষ্ঠতা বা ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’র ধারণার পরিবর্তে সামনে আসছে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা।

দুই দেশ এখনও বহু ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করবে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়ে গেছে। তবে সেই সহযোগিতা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্দিষ্ট, সীমিত এবং হিসাবনির্ভর হবে।

এই পরিবর্তন ভারতীয় কূটনীতির জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। কারণ নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও দেখাতে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্ব কেবল ঘোষণায় নয়, সক্ষমতায় নির্ধারিত হয়। আর সেই সত্যটাই আজ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন অধ্যায়কে সংজ্ঞায়িত করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

০৮:০০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

গত তিন দশক ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে অনেকেই একটি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বের গল্প হিসেবে দেখেছেন। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে দুই দেশের মধ্যে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল, তা বহু পর্যবেক্ষকের কাছে এক ধরনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’-এর রূপ নিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা কখনো স্থির থাকে না। শক্তির ভারসাম্য বদলায়, অগ্রাধিকার বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মূল্যায়নও।

আজ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের প্রত্যাশা খুব বেশি বদলায়নি, কিন্তু আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়েছিল কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণে। চীনের উত্থানের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত ভারসাম্য, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা, মার্কিন বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদের সুযোগ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—এসবই ছিল ভারতের প্রধান স্বার্থ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত দেখেছে এমন একটি শক্তি হিসেবে, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেশটির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রেরও ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রায় একই রকম। ভারতকে দেখা হতো এশিয়ায় চীনের ভারসাম্য রক্ষাকারী সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে। পাশাপাশি এটি ছিল একটি বড় বাজার, বিনিয়োগের ক্ষেত্র, দক্ষ কর্মশক্তির উৎস এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সম্ভাব্য ক্রেতা। তবে এই সম্পর্ক কখনো আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ নেয়নি; বরং ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ নামের একটি নমনীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু সমস্যার শুরু হয়েছে তখন, যখন ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করে।

পরিবর্তিত ভূরাজনীতির প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিকে বোঝার জন্য ইউরেশিয়াকে একটি একক কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে দেখতে হয়। ইউরোপে রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা এবং পূর্ব এশিয়ায় চীনের উত্থান—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রে ছিল। একসময় মনে করা হয়েছিল, ভারত এই তিন ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখতে পারবে।

US-India relations at a crossroads - The Business Times

রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে ভারত হয়তো মস্কোর ওপর কিছু প্রভাব বিস্তার করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। আবার উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের গভীর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক তাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। আর চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ভারতকে দেখা হয়েছিল এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই ধারণাগুলোর অনেকটাকেই দুর্বল করে দিয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে এবং রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখে। ফলে ওয়াশিংটনের চোখে ভারত রাশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি। একইভাবে পশ্চিম এশিয়ার নানা কূটনৈতিক সমীকরণেও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ভারতকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে দেখেনি।

চীন প্রসঙ্গে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে চীনকে ঘিরে মার্কিন কৌশলে।

একসময় ধারণা ছিল, ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি চীনের শক্তির একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবধান কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।

অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাও সবসময় মার্কিন প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ভারত কখনোই প্রকাশ্য চীনবিরোধী সামরিক জোটের অংশ হতে আগ্রহী ছিল না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে, কিন্তু ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও স্বতন্ত্র থেকেছে।

এর পেছনে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত যুক্তি রয়েছে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর নীতি অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু একই নীতি ওয়াশিংটনের কাছে কখনো কখনো সীমাবদ্ধতা হিসেবেও প্রতীয়মান হয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার নতুন রূপ

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে প্রধানত সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। বাণিজ্য ঘাটতি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ—এসব ক্ষেত্র এখন মার্কিন নীতির কেন্দ্রে।

এই নতুন প্রতিযোগিতার ময়দানে ভারতের অবস্থান এখনও সীমিত। বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের বিকল্প হিসেবে ভারত কিছু অগ্রগতি করলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। একইভাবে উন্নত চিপ উৎপাদন, এআই অবকাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে ভারতকে ওয়াশিংটন অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করে না।

US-India Partnership: Crisis Management in the Pandemic Era and Future of the  Relationship | Vivekananda International Foundation

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের প্রকৃতি বদলে গেছে। ভারত আর এমন একটি দেশ নয়, যাকে শক্তিশালী করে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। বরং এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার, বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্রেতা—এই পরিচয়েই বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে।

নতুন যুগের কূটনীতি

এর অর্থ এই নয় যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। বরং সম্পর্কটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। আবেগ, প্রতীকী ঘনিষ্ঠতা বা ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’র ধারণার পরিবর্তে সামনে আসছে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা।

দুই দেশ এখনও বহু ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করবে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়ে গেছে। তবে সেই সহযোগিতা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্দিষ্ট, সীমিত এবং হিসাবনির্ভর হবে।

এই পরিবর্তন ভারতীয় কূটনীতির জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। কারণ নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও দেখাতে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্ব কেবল ঘোষণায় নয়, সক্ষমতায় নির্ধারিত হয়। আর সেই সত্যটাই আজ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন অধ্যায়কে সংজ্ঞায়িত করছে।