মালয়েশিয়া তেল উৎপাদনকারী দেশ—এই পরিচয় থেকেই অনেকের ধারণা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অভিঘাত দেশটির অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে কম পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ২০২২ সাল থেকেই মালয়েশিয়া অপরিশোধিত তেলের নিট আমদানিকারক। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি করলেও আমদানি করেছে প্রায় ১৫.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। অর্থাৎ শুধু অপরিশোধিত তেলেই বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এর পেছনে রয়েছে একটি বাণিজ্যিক যুক্তি। মালয়েশিয়ার নিজস্ব তেলক্ষেত্র থেকে পাওয়া টাপিস ও কিনামানিসের মতো হালকা ও কম সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পায়। ফলে বেশি মূল্যের দেশীয় তেল রপ্তানি করে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও ভারী মধ্যপ্রাচ্যের তেল আমদানি করে শোধনাগারে ব্যবহার করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। কিন্তু এই হিসাব তখনই কার্যকর, যখন সরবরাহের পথ নির্বিঘ্ন থাকে।
হরমুজ প্রণালির সংকট সেই নির্ভরতার দুর্বল জায়গাটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি সরু জলপথ, বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি
মালয়েশিয়ার অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন একটি সমুদ্রপথ দিয়ে আসে, যার সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৪ কিলোমিটার। ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক সংকটও খুব দ্রুত মালয়েশিয়ার জ্বালানি ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং ভোক্তা মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
এর আর্থিক অভিঘাত বোঝার জন্য তিনটি দিক গুরুত্বপূর্ণ—জ্বালানি ভর্তুকির বাড়তি চাপ, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব।
সংকটের আগে মালয়েশিয়ার মাসিক জ্বালানি ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত। কিন্তু ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে ওঠার পর সেই ব্যয় মাসে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন রিঙ্গিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রন৯৫ পেট্রোলে প্রায় ২ বিলিয়ন এবং ডিজেলে ১.২ বিলিয়ন রিঙ্গিত।
অর্থাৎ প্রতিদিন সরকারের অতিরিক্ত ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ৮৩ মিলিয়ন রিঙ্গিত। এই অর্থের আকার বোঝাতে বলা যায়, প্রতিদিনের এই ব্যয় দিয়ে একটি গ্রামীণ স্কুল নির্মাণ করা সম্ভব হতে পারে, অথবা ৫ হাজার রিঙ্গিত করে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ মাসিক নগদ সহায়তা দেওয়া যেত।
আমদানি ব্যয়ের আরেক ধাক্কা
মালয়েশিয়া ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ২০২৫ সালেও পরিমাণটি কাছাকাছি ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম যদি প্রায় ১০০ ডলারে থাকে, তাহলে সংকট-পূর্ব প্রায় ৬৫ ডলারের তুলনায় প্রতিদিনের অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ১৩.৩ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫৮ মিলিয়ন রিঙ্গিত।
দাম যদি আবার ১২৬ ডলারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে, তাহলে অতিরিক্ত দৈনিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ২৪.৭ মিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে।
এই চাপ শুধু জ্বালানি আমদানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন, কৃষি, বিমান চলাচল এবং পণ্য সরবরাহের খরচও বাড়ে। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে মূল্যস্ফীতির চাপ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রবৃদ্ধির ওপর দ্বিমুখী চাপ
তেলের দাম বাড়লে তেল ও গ্যাস খাত থেকে মালয়েশিয়ার রাজস্বও বাড়তে পারে। কিন্তু দাম খুব দ্রুত ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই সুবিধা আর যথেষ্ট থাকে না। আসলে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় উৎপাদন খরচ বাড়ায়, মানুষের ভোগক্ষমতা কমায় এবং বিনিয়োগের আগ্রহে চাপ সৃষ্টি করে।
আসিয়ান+৩ ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের গবেষণা অনুযায়ী, ব্রেন্টের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার বাড়লে মালয়েশিয়ার বার্ষিক প্রকৃত জিডিপিতে প্রায় ৬৪৬ মিলিয়ন রিঙ্গিতের সম্পর্কিত প্রভাব দেখা যায়। তবে এই সম্পর্ক সরল নয়। সীমিত মূল্যবৃদ্ধি মালয়েশিয়ার জ্বালানি আয় বাড়াতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের আকস্মিক মূল্যবিস্ফোরণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান সংকটের হিসাবও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। গড়ে ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারে থাকলে, ২০২৬ সালের বাজেটে ধরা ৬৫ ডলারের তুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব প্রায় ১০.৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত বাড়তে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত জ্বালানি ভর্তুকির দায় আনুমানিক ১৯.৮ বিলিয়ন রিঙ্গিত হলে রাজস্ব বৃদ্ধির সুবিধা পুরোপুরি মুছে যায়। ফলে নিট আর্থিক অবনতি হতে পারে প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন রিঙ্গিত এবং বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু বাস্তব
তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তা মূল্যসূচকে কিছুটা সময় নিয়ে প্রতিফলিত হয়। সিজিএস ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, গড় তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে মালয়েশিয়ার বার্ষিক ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ৭ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ১.৪ শতাংশ। কিন্তু জ্বালানি ব্যয়ের উচ্চ মাত্রা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে সংকটের সরাসরি দৈনিক আর্থিক অভিঘাত প্রায় ১৬৭ মিলিয়ন রিঙ্গিতের কাছাকাছি হতে পারে—যার বড় অংশ আসে ভর্তুকি ও অপরিশোধিত তেল আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় থেকে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষতির হিসাব নয়।
বীমা, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাড়তি ব্যয়, পেট্রোকেমিক্যাল ও উৎপাদন খাতে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব যুক্ত হলে প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বড় হতে পারে। মার্চের শুরু থেকে জাহাজের বীমা ব্যয় চার থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার কিছু সুরক্ষা বলয় আছে
তবু মালয়েশিয়াকে পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখলে চিত্র অসম্পূর্ণ থাকবে। তেল ও গ্যাস মিলিয়ে দেশটি এখনো নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক। ২০২৫ সালে এ খাতে নিট জ্বালানি উদ্বৃত্ত জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশ ছিল।
আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়লে পেট্রোনাসের আয় বাড়ে, সরকারের জ্বালানি-সম্পর্কিত রাজস্ব বাড়তে পারে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি থেকেও বাড়তি আয় আসে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত দেশীয় গ্যাসের বড় অংশ মালয়েশিয়ার নিজস্ব সমুদ্রসীমার গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও এলএনজি আমদানি করা হয়। ফলে হরমুজের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরাসরি নির্ভরতা তুলনামূলক কম।
অন্যদিকে পেট্রোনাস পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে এসব অঞ্চল থেকে আসা তেল মোট আমদানির ২২ শতাংশের বেশি ছিল। পেংরাংয়ের পিআরইফকেম শোধনাগার, যা সৌদি আরামকোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত, মালয়েশিয়ার শোধন সক্ষমতাতেও অতিরিক্ত নমনীয়তা তৈরি করেছে।
কিন্তু এসব সুবিধা সংকটের প্রভাব পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। কারণ উচ্চ তেলের দাম থেকে বাড়তি আয় সরকারের কাছে আসতে সময় লাগে, অথচ ভর্তুকির ব্যয় বাড়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
নীতিতে এখন যে পরিবর্তন জরুরি
হরমুজ সংকট মালয়েশিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি রেখেছে, তা হলো জ্বালানি ভর্তুকি কীভাবে টেকসই করা যায়। মাসে ৩.২ বিলিয়ন রিঙ্গিত ভর্তুকি দীর্ঘ সময় বহন করা কঠিন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে।
রন৯৫-এর দাম দুই মাস ১.৯৯ রিঙ্গিত রাখার জন্য সরকার বুদি৯৫ কর্মসূচি চালু করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হতে পারে ভর্তুকি তুলে দেওয়া নয়; বরং কারা ভর্তুকি পাবেন, সেটিকে আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিয়ে উচ্চআয়ের ভোক্তাদের জন্য ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক মূল্য সমন্বয় করা গেলে সরকারের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে তেলের সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ দ্রুত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের সময় শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ কৌশল নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। তেলের দাম বাড়া সরবরাহ-নির্ভর মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে নীতিগত সুদহার বাড়ালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ধীর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং চীনের চাহিদা কমে যাওয়ার মতো বহিরাগত চাপ যখন ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
ব্যবসায়িক খাতেও ঝুঁকি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন, কৃষি, বিমান চলাচল এবং কম মুনাফার শিল্পগুলো জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মালয়েশিয়ার ইউরিয়া সার আমদানিরও একটি অংশ আসে, ফলে কৃষি খাতেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। এসব খাতে ঋণগ্রহীতাদের সক্ষমতা ও ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানও নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
ভূগোলের মূল্য আছে
হরমুজ সংকট মালয়েশিয়ার জন্য একটি মৌলিক শিক্ষা সামনে এনেছে। কোনো দেশ তেল উৎপাদন করে বলেই বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কা থেকে নিরাপদ হয়ে যায় না। উৎপাদনের ধরন, আমদানির কাঠামো এবং সরবরাহপথ—সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ধারিত হয়।
মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি সরু জলপথও প্রতিদিন দেশটির সরকারি ভর্তুকিতে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন রিঙ্গিতের চাপ তৈরি করতে পারে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় বাড়াতে পারে আরও প্রায় ৫৮ মিলিয়ন রিঙ্গিত।
এই সংখ্যাগুলো আতঙ্ক ছড়ানোর পূর্বাভাস নয়। বরং এগুলো সংকটের অর্থনৈতিক গতি বোঝার একটি পরিমাপক। প্রতিটি দিন সরবরাহ ব্যাহত হলে তার একটি মূল্য আছে; আবার সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রতিটি দিন অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তিও ফিরিয়ে আনে।
তাই মালয়েশিয়ার সামনে এখন তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট—ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ উৎস ও পরিবহনপথ বহুমুখী করা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা।
হরমুজের সংকট হয়তো মালয়েশিয়ার হাতে তৈরি নয়। কিন্তু এই সংকট থেকে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা শক্তিশালী হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন মালয়েশিয়ারই।
মুহাম্মদ আফিক আবদুল্লাহ 


















