ব্রিটেনের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যাওয়ায় বন্দিদের আগাম মুক্তি দেওয়ার বিতর্ক এখন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে দায়িত্ব পালনকালে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যাকারীদেরও আগাম মুক্তির আওতায় আসার সম্ভাবনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।
হার্পার হত্যাকাণ্ড ঘিরে নতুন বিতর্ক
২৮ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পার দায়িত্ব পালনের সময় নিহত হন। বিয়ের মাত্র চার সপ্তাহ পর বার্কশায়ারে তিন কিশোরকে একটি চার চাকার মোটরযান চুরি ঠেকাতে গিয়ে তিনি তাদের পালানোর গাড়ির টেনে নেওয়া দড়িতে আটকে যান। দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটে যাওয়ায় ভয়াবহভাবে আহত হয়ে তার মৃত্যু হয়।
২০২০ সালে ওই ঘটনায় জড়িতদের অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে দুজন এখন সরকারের আগাম বন্দিমুক্তি পরিকল্পনার আওতায় পড়ছেন।
কারাগারগুলোতে জায়গার সংকট এতটাই তীব্র যে সরকার বলছে, আগাম মুক্তির ব্যবস্থা না করলে পুরো কারা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে হার্পারের হত্যাকারীদেরও মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রায় ১০ লাখ মানুষ একটি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করার পর বার্নহাম অবস্থান বদলান। ১১ আগস্ট তিনি জানান, হার্পারের হত্যাকারীদের কারাগারেই রাখার বিষয়ে তিনি ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন।

কেন কারাগারে এত চাপ
২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শ্রমিক দল সরকার জরুরি ভিত্তিতে আগাম বন্দিমুক্তির ব্যবস্থা চালু করেছিল। তখন কারাগারগুলোর প্রায় ৯৯ শতাংশ জায়গা পূর্ণ ছিল। এবার নতুন পরিকল্পনায় আরও কম সময় কারাগারে রাখার প্রস্তাব এসেছে।
আগামী ১ অক্টোবর থেকে তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোগের পরিবর্তে মাত্র ৩৩ শতাংশ সময় কারাগারে কাটানোর পর মুক্তির সুযোগ দেওয়া হবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে, যার মধ্যে অনিচ্ছাকৃত হত্যাও রয়েছে, দুই-তৃতীয়াংশ সাজা ভোগের বদলে অর্ধেক সাজা কাটানোর পর মুক্তির জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেনে অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কারাদণ্ডের হার এবং গড় কারাদণ্ডের মেয়াদ বেড়েছে। কিন্তু কারাগারের ধারণক্ষমতা ২০১২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
বন্দির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা
বর্তমানে ব্রিটেনের কারাগারে প্রায় ৮৫ হাজার ৬০০ বন্দি রয়েছে, যা মোট ধারণক্ষমতার প্রায় ৯৭ শতাংশ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
কারাগারে অতিরিক্ত ১৪ হাজার আসন তৈরিতে সরকার প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করছে। কিন্তু তারপরও আগামী বছরই আবার কারাগারে জায়গার সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের কারাবন্দির হার সবচেয়ে বেশি। অথচ গত বছর তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড পাওয়া প্রায় ৯০ হাজার মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সাজা ছিল এক বছর বা তার কম। এমন স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ড অপরাধীদের সংশোধনের বদলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আরও অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। এই শ্রেণির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

হার্পারের আইন কেন কাজে আসছে না
হার্পারের মৃত্যুর পর ২০২২ সালে ব্রিটিশ সংসদ আইন পরিবর্তন করে। দায়িত্ব পালনরত জরুরি সেবাকর্মীকে অপরাধ সংঘটনের সময় হত্যা করলে বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান করা হয়।
কিন্তু নতুন আইনটি আগের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে হার্পার হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিরা সেই কঠোর আইনের আওতায় পড়ছেন না।
এ কারণেই বার্নহামের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে কারাগারে জায়গা নেই, অন্যদিকে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি দিলে জননিরাপত্তা ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
জায়গা খালি করার কঠিন পথ
কারাগারে অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করতে সরকার কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বিদেশি বন্দির নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করা, অনির্দিষ্টকাল আটক থাকা প্রায় ২ হাজার ৩০০ ব্যক্তির বিষয়ে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া এবং কিছু নারী কারাগার খালি করে সেগুলো পুরুষ বন্দিদের জন্য ব্যবহার করা।
কিন্তু প্রতিটি উদ্যোগের সঙ্গেই আইনি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। ফলে কারাগার সংকট এখন শুধু বিচারব্যবস্থার সমস্যা নয়, এটি নতুন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও বড় পরীক্ষা।
বার্নহামের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—কারাগারে জায়গা তৈরি করতে গিয়ে তিনি কতটা ঝুঁকি নেবেন, আর একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করে জনসাধারণের আস্থা কতটা ধরে রাখতে পারবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















