চীনের অর্থনীতিতে জমে থাকা বিপুল ঋণের বোঝা কমানোর জন্য যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছিল, তাদেরই কয়েকটি এখন ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। ঋণগ্রস্ত ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী ঋণ সামলে নেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠান নিজেরাই বিপুল ঋণের বোঝায় আটকে গেছে। ফলে চীনের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রকাশ্য হিসাবের বাইরেও আরও বড় ধরনের ঋণঝুঁকি লুকিয়ে আছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঋণবোমা নিষ্ক্রিয় করতে তৈরি হয়েছিল যেসব প্রতিষ্ঠান
চীনে ব্যাংকগুলোর বিপজ্জনক ও অনাদায়ী ঋণ সরিয়ে ফেলার জন্য ১৯৯৯ সালে চারটি বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। দেশটির চার বৃহৎ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা ছিল।
উদ্দেশ্য ছিল, ব্যাংকের হিসাব থেকে খারাপ ঋণ সরিয়ে নিয়ে সেগুলো পুনর্গঠন করা, সম্পদ বিক্রি করা এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ঋণ সামলানোর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
চারটি থেকে এখন ৬০টির বেশি
২০১৮ সালের মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ কোটি ইউয়ানে পৌঁছে যায়। এর মধ্যে তারা চীনের অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

এরপর ২০১০-এর দশকের শুরুতে অনাদায়ী ঋণ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন প্রদেশেও স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠনের অনুমতি দেওয়া হয়। এখন চীনে এ ধরনের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬০টির বেশি।
বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা স্থানীয় সরকার বা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানাধীন। আনহুই প্রদেশের গুয়োহৌ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান তেমনই একটি।
প্রায় ১২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত গুয়োহৌ এখন নিজেই এমন এক ঋণসংকটে পড়েছে, যেখান থেকে বের হতে তাকে পুনর্গঠনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
ঋণ সামলানোর বদলে নিজেরাই ঋণ দিতে শুরু করে
সমস্যার শুরু হয় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক চরিত্র বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণ কিনে নেওয়ার পরিবর্তে অনেক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকেই কম সুদে বিপুল অর্থ ধার করতে শুরু করে। পরে সেই অর্থ বেশি সুদে ঋণ হিসেবে তুলে দেওয়া হয় বিপদগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে।
ফলে ঋণ উদ্ধারের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অনেকটা বিনিয়োগ ব্যাংকের মতো কাজ করতে শুরু করে।
চীনের আবাসন খাত যখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল, তখন সম্পত্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঋণের বড় গ্রাহক ছিল। কিন্তু আবাসনবাজারে ধস নামার পর সেই ঋণের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
ব্যাংকের খারাপ ঋণ আড়াল করার অভিযোগ

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণ নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে আড়াল করতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গবেষকদের হিসাব বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড এত ব্যাপক ছিল যে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের প্রকৃত অনাদায়ী ঋণের অন্তত অর্ধেক সরকারি হিসাবের বাইরে থাকার সম্ভাবনা ছিল।
অর্থাৎ ব্যাংকের হিসাবে যতটা খারাপ ঋণ দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।
হুয়ারংয়ের পতন ছিল বড় সতর্কবার্তা
চীনের সবচেয়ে বড় ও আগ্রাসী সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হুয়ারং ২০২০ সালে ভয়াবহ সংকটে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার সমপরিমাণ সরকারি সহায়তা দিয়ে উদ্ধার করতে হয়।
এর চেয়ারম্যান লাই শিয়াওমিন পরে একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিন্তু সেই ঘটনা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
গুয়োহৌর কর্মকাণ্ডেও একই ছক
গুয়োহৌর পুনর্গঠনসংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি একই ধরনের বেশ কিছু কৌশল অনুসরণ করেছিল।
অনাদায়ী সম্পদ কেনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ সুদের ঋণ দিতে শুরু করে। এসব ঋণের কিছু এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে সেগুলো সরাসরি ঋণ হিসেবে না দেখিয়ে মূলধনী বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এতে নিয়ন্ত্রকদের কাছে ঋণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হতো।
ব্যাংকের সঙ্গেও করা হয়েছিল বিশেষ ধরনের গোপন সমঝোতা। কোনো অনাদায়ী ঋণ নিয়ন্ত্রকদের কাছে প্রকাশ করার সময় ঘনিয়ে এলে গুয়োহৌ সেটি ব্যাংক থেকে কিনে নিত। কিছুদিন পর আবার ব্যাংকের কাছেই তা বিক্রি করে দিত। এর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি ফি পেত।
তদন্তে দেখা যায়, গুয়োহৌ বছরের পর বছর লোকসান করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইউয়ান ঋণের দায় পরিশোধ করার মতো সক্ষমতাও প্রতিষ্ঠানটির আর ছিল না।
সরকারি হিসাবের চেয়ে বড় হতে পারে অনাদায়ী ঋণ
গুয়োহৌর ঘটনা চীনের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থাকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চীনা ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ঋণ ২০২২ সালে প্রায় ৩ লাখ কোটি ইউয়ান ছিল। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ইউয়ানে পৌঁছেছে।
মোট সম্পদের তুলনায় এই হার প্রায় দেড় শতাংশ। কাগজে-কলমে এটি খুব বড় মনে না হলেও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কতটা খারাপ ঋণ ব্যাংকের হিসাবের বাইরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আবাসন সংকট বাড়লে ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে
চীনের আবাসন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দেশটির অনেক কোম্পানি ব্যাংকঋণের বিপরীতে জমি ও ভবনকে জামানত হিসেবে রেখেছে। আবাসনবাজারে সম্পত্তির মূল্য আরও কমে গেলে এসব জামানতের মূল্যও কমে যাবে। ফলে ব্যাংক ও ঋণ উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ আবাসন সংকট শুধু নির্মাণ ও সম্পত্তি ব্যবসার সমস্যা নয়; এটি চীনের পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
বড় প্রতিষ্ঠানও বিপাকে
চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানাধীন বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সিনদা চলতি মাসে জানিয়েছে, বছরের প্রথমার্ধে তাদের নিট মুনাফা সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এর অন্যতম কারণ হতে পারে অনাদায়ী ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া।
ছোট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক। উত্তর-পূর্ব চীনের একটি প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে একটি ফুটবল ক্লাবকে সন্দেহজনক ঋণ দেওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থার কাছ থেকে নিম্নমানের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং ধসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
গুয়োহৌকে বন্ধ না করে কেন পুনর্গঠন?
গুয়োহৌর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ না করে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো, প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ব্যবস্থাপনার অনুমতিপত্রের প্রতি এখনো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে।
গত বছর থেকে চীনা নিয়ন্ত্রকেরা নতুন করে এ ধরনের অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিদ্যমান অনুমতিপত্রের মূল্য আরও বেড়েছে।
তবে গুয়োহৌতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আসল ভয় লুকিয়ে আছে হিসাবের বাইরে
গুয়োহৌর ঘটনা চীনের অর্থনীতির একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ছিল ব্যাংক ও কোম্পানির খারাপ ঋণ সরিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাকে পরিষ্কার করা, তারাই যদি নতুন করে ঋণ তৈরি করে এবং পুরোনো ঋণ আড়াল করতে সাহায্য করে, তাহলে সংকটের সমাধান হয় না। বরং সমস্যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে রাখা হয়।
চীনের আবাসনবাজারের দুর্বলতা যত বাড়বে, ততই এসব লুকানো ঝুঁকি সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
গুয়োহৌ হয়তো প্রথম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, যাকে নিজের ঋণবোমা নিষ্ক্রিয় করতে হচ্ছে। কিন্তু এটি শেষ ঘটনা নাও হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















