বিজ্ঞানের অগ্রগতি কি সত্যিই আগের তুলনায় ধীর হয়ে গেছে? বহুদিন ধরেই এমন দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তি কমে যাওয়ার যে বহুল আলোচিত প্রমাণ সামনে আনা হয়েছিল, তার বড় অংশই হয়তো তথ্যের ভুল শ্রেণিবিন্যাস থেকে তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল পার্ক ও তাঁর সহকর্মীরা প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র এবং ৩৯ লাখ উদ্ভাবনী পেটেন্ট বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে নতুন বৈজ্ঞানিক কাজের ‘বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতা’ ব্যাপকভাবে কমেছে। গবেষণাটি এতটাই আলোচিত হয় যে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও এর প্রভাব দেখা যায়।
কিন্তু এবার সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে।
গবেষণার মাপকাঠিতেই কি সমস্যা ছিল
১২ আগস্ট প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় ব্রাসেলসের ভ্রিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভিনসেন্ট হলস্ট ও তাঁর সহকর্মীরা দাবি করেছেন, আগের গবেষণার ফলাফলের বড় অংশই বাস্তব অবনতির প্রতিফলন নয়। বরং গবেষণার তথ্যভান্ডারে থাকা ভুল শ্রেণিবিন্যাসের কারণে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি স্থবির বলে মনে হয়েছে।

আগের গবেষণায় একটি বিশেষ সূচক ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয় কোনো গবেষণাপত্র তার ক্ষেত্রকে কতটা বদলে দিয়েছে। কোনো গবেষণাপত্রের পরবর্তী গবেষণাগুলো যদি মূল গবেষণাপত্রটির পাশাপাশি তার আগের সূত্রগুলোকেও উদ্ধৃত করে, তাহলে সেটিকে মূলত আগের জ্ঞানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কাজ হিসেবে ধরা হয়। আর পরবর্তী গবেষণাগুলো যদি শুধু নতুন গবেষণাটিকেই উদ্ধৃত করে এবং তার আগের সূত্রগুলোকে আর গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সেটিকে বৈপ্লবিক বা পরিবর্তনশীল গবেষণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই সূচকের মান ঋণাত্মক এক থেকে ধনাত্মক এক পর্যন্ত হতে পারে। ধনাত্মক এক মানে সর্বোচ্চ মাত্রার বৈপ্লবিক পরিবর্তন, আর ঋণাত্মক এক মানে পূর্ববর্তী জ্ঞানের ওপর সর্বাধিক নির্ভরশীলতা।
প্রায় ১০ লাখ গবেষণাপত্র নিয়ে প্রশ্ন
হলস্টের দল দেখতে পায়, আগের বিশ্লেষণে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার গবেষণাপত্র এবং ১ লাখ ৪২ হাজার পেটেন্টকে সর্বোচ্চ মাত্রার বৈপ্লবিক হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। কারণ এসব কাজের কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু পরবর্তী কোনো গবেষণায় সেগুলো উদ্ধৃত হয়েছিল।
সমস্যা হলো, এগুলোর অনেকগুলোতেই বাস্তবে সূত্র ছিল। গবেষকরা এমন একশটি গবেষণাপত্র ও পেটেন্ট এলোমেলোভাবে পরীক্ষা করে দেখেন, ৯৩ শতাংশ গবেষণাপত্র এবং ৯৮ শতাংশ পেটেন্টে প্রকৃতপক্ষে সূত্র উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ তথ্যভান্ডারই সেগুলোকে ভুলভাবে সূত্রহীন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে এই ভুল শ্রেণিবিন্যাসের হার কমেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে পুরোনো সময়ের বিপুলসংখ্যক গবেষণাকে ভুলভাবে অত্যন্ত বৈপ্লবিক হিসেবে গণ্য করা হলে পরবর্তী সময়ের গবেষণাকে তুলনামূলকভাবে কম বৈপ্লবিক মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
এই ভুল বাদ দিলে বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তি কমে যাওয়ার কথিত পতনের বড় অংশই আর দেখা যায় না।
মূল গবেষকরা অবশ্য একমত নন
মাইকেল পার্ক ও তাঁর সহকর্মীরা অবশ্য নতুন এই সমালোচনা মেনে নেননি। একই সময়ে প্রকাশিত তাঁদের জবাবে তারা বলেছেন, নতুন গবেষকদের প্রস্তাবিত সংশোধন পদ্ধতি ব্যবহার করেও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনী শক্তির অর্থবহ পতন দেখা যায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো তথ্যের উৎস। পার্কের মূল গবেষণার অন্যতম ভিত্তি ছিল একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার, যা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। অন্যদিকে হলস্ট ও তাঁর সহকর্মীরা আংশিকভাবে একটি উন্মুক্ত বিকল্প তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেছেন।
পার্কের অভিযোগ, এই বিকল্প তথ্যভান্ডারে সূত্রহীন হিসেবে চিহ্নিত গবেষণার সংখ্যা মূল তথ্যভান্ডারের তুলনায় অনেক বেশি। হলস্টের পাল্টা বক্তব্য, মূল তথ্যভান্ডার উন্মুক্ত না হলেও তাঁরা সেটিতে ব্যবহৃত তথ্যের কাঠামো পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং তাঁদের সমালোচনা এখনও যথার্থ।
ফলে বিতর্কটি এখন শুধু বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে নয়; গবেষণার তথ্যভান্ডার, তথ্যের মান এবং পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি নিয়েও।
আরও একটি গবেষণা আগের দাবিকে দুর্বল করেছে
পার্কের গবেষণাই একমাত্র প্রমাণ নয় যে বিজ্ঞানের অগ্রগতি কমছে—আবার সেটিই একমাত্র প্রমাণও নয় যে এমন পতন ঘটছে না।
গত বছর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক যুক্তি দেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা যত বাড়বে, উদ্ধৃত করার মতো আগের কাজের সংখ্যাও তত বাড়বে। ফলে কোনো নতুন গবেষণাপত্রের গড় বৈপ্লবিকতার সূচক সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কমতে পারে। তাঁদের পুনর্বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনী শক্তি বরং বেড়েও থাকতে পারে।
অর্থাৎ শুধু উদ্ধৃতির সংখ্যা বা একটি সূচকের পতন দেখে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ধীর হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ।
তবু বিজ্ঞানের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
তবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। ২০২০ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস ব্লুম ও তাঁর সহকর্মীরা বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদনশীলতা বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, নতুন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জনের জন্য ক্রমেই বেশি গবেষণা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থাৎ একদিকে গবেষণাপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ বিজ্ঞানের কথিত স্থবিরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতার তথ্য বলছে, বড় ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাই একটি বিষয়ই স্পষ্ট—বিজ্ঞান তার সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছে কি না, তার উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। বরং বিজ্ঞান কতটা দ্রুত এগোচ্ছে, তা মাপার পদ্ধতিটিই এখন বড় বৈজ্ঞানিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞানের উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা নিজেই যদি ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেটিই হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস।
বিজ্ঞান যতটা ধীর হয়েছে, তার চেয়ে হয়তো আমাদের মাপার পদ্ধতিই বেশি সমস্যায় পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















