ভ্রমণ পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যতই বাড়ছে, ততই যেন নতুন করে গুরুত্ব ফিরে পাচ্ছেন মানব ট্রাভেল এজেন্টরা। বিশেষ করে বিলাসবহুল ভ্রমণের ক্ষেত্রে ধনী পর্যটকদের একটি বড় অংশ এখনো এমন মানুষের ওপর নির্ভর করতে চান, যিনি শুধু বিমানের টিকিট বা হোটেল বুক করবেন না, বরং পুরো সফরটিকে ব্যক্তিগত পছন্দ, আরাম, নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে নিখুঁত করে তুলবেন।
কানাডার ভ্রমণ-পরামর্শক অলিভিয়া ফার্নির কাজ তারই ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ধনী গ্রাহক বছরে ভ্রমণের পেছনে অন্তত ১০ লাখ ডলার ব্যয় করেন। এর সঙ্গে দিতে হয় এক লাখ ডলারের বার্ষিক সদস্যপদ ফি। গ্রাহকদের আবদারও সাধারণ নয়। কারও জন্য প্যারিসে উড়ে গিয়ে বিশেষ ধরনের ক্রোসাঁ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হয়, আবার কেউ এমন অসম্ভব অনুরোধও করেন—বৃষ্টি থামাতে প্রয়োজন হলে যেন সংশ্লিষ্ট যে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এ ধরনের অদ্ভুত ও বিলাসী অনুরোধই ফার্নিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয় করেছে। তাঁর প্রায় ২০ লাখ অনুসারী নিয়মিত তাঁর ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার গল্প দেখেন। এমনকি তাঁর এই পেশাজীবনকে কেন্দ্র করে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিড়েও মানুষের চাহিদা
একসময় মনে করা হয়েছিল, অনলাইনে কয়েকটি প্রশ্ন করলেই যখন মুহূর্তের মধ্যে ভ্রমণসূচি তৈরি করা যায়, তখন ট্রাভেল এজেন্টদের প্রয়োজন দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

যুক্তরাজ্যে গত বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যটক মানব ভ্রমণ বিশেষজ্ঞের সহায়তায় ছুটির ভ্রমণ বুক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও ভ্রমণ পরামর্শকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য ছিল প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার, সেখানে এখন সেই সংখ্যা তিন লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে।
এর কারণ কেবল বুকিংয়ের সুবিধা নয়। একজন অভিজ্ঞ ভ্রমণ পরামর্শক পর্যটকের ব্যক্তিগত রুচি বুঝে পুরো সফরের পরিকল্পনা সাজাতে পারেন। কোন দেশে কোন সময়ে যাওয়া ভালো, কোন হোটেলের কোন কক্ষটি বেশি আরামদায়ক, কোন রেস্তোরাঁ স্থানীয় স্বাদের পাশাপাশি বিশেষ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলে কিংবা কোন জায়গায় নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।
অভিজ্ঞতা ও রুচির মূল্য
বিলাসবহুল ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকের চাহিদা অনেক সময় সাধারণ পর্যটন পরিকল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যায়। কেউ বিশেষ খাবার চান, কেউ একা ভ্রমণ করতে চান, আবার কেউ পোষা প্রাণী সঙ্গে নিয়ে বিদেশে যেতে চান। কারও প্রয়োজন বিশেষ খাদ্য-নিরাপত্তা, কারও আবার প্রয়োজন অত্যন্ত নিরিবিলি পরিবেশ।
এখানেই মানব পরামর্শকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বড় সম্পদ হয়ে ওঠে। একজন দক্ষ এজেন্ট কেবল তথ্য দেন না; তিনি বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে থেকে কোনটি পর্যটকের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে, সে বিষয়ে বিচার-বিবেচনাও করেন।
অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো শত শত হোটেলের তালিকা দিতে পারে, কিন্তু কোন হোটেলটি একজন নির্দিষ্ট পর্যটকের স্বভাব, রুচি ও প্রত্যাশার সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মানাবে—সেই সিদ্ধান্তে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
বিপদে মানুষের সহায়তা
ভ্রমণের সময় সবকিছু পরিকল্পনামতো চলে না। বিমান দেরি করতে পারে, লাগেজ হারিয়ে যেতে পারে, হোটেলে ভুল কক্ষ দেওয়া হতে পারে কিংবা বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার গাড়ি নির্ধারিত সময়ে নাও আসতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ভ্রমণসূচি কোনো বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু একজন মানব পরামর্শক ফোনের অপর প্রান্তে থেকে দ্রুত হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, পরিবহন বদলে দিতে পারেন কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চরম আবহাওয়ার সময় এই মানবিক সহায়তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিদেশে বুকিং করার সময় পর্যটকেরা এমন একজন বিশ্বস্ত মানুষের ওপর নির্ভর করতে স্বস্তি বোধ করেন, যিনি প্রয়োজনে তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শত্রু নয়, সহকারী বানাচ্ছেন এজেন্টরা
তবে ট্রাভেল এজেন্টরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরোধিতা করছেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাজকে দ্রুত ও কার্যকর করতে এই প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করছে।
ভ্রমণ সংস্থাগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রশাসনিক ও একঘেয়ে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করছে। তথ্য সাজানো, প্রাথমিক গবেষণা, ভ্রমণসূচির খসড়া তৈরি কিংবা বিভিন্ন বিকল্প তুলনা করার মতো কাজে প্রযুক্তি সময় বাঁচাচ্ছে। ফলে মানব পরামর্শকেরা তাঁদের মূল্যবান সময় গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আরও সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় ব্যয় করতে পারছেন।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হয়তো মানুষ বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে আরও দক্ষ মানব সেবা দেওয়ার প্রতিযোগিতা।
সাধারণ ভ্রমণে প্রযুক্তি, বিলাসী ভ্রমণে মানুষ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হবে, সাধারণ পর্যটকেরা নিজেরাই ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সুযোগ তত বেশি পাবেন। কয়েকটি তথ্য দিলেই কোথায় যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে এবং কী কী দেখা যায়—এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে।

কিন্তু বিলাসবহুল ভ্রমণের বাজারে বিষয়টি আলাদা। সেখানে অর্থের চেয়ে সময়, ব্যক্তিগত পছন্দ, একান্ততা, নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার মূল্য বেশি। একজন পর্যটক যখন কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ খরচ করে ভ্রমণে বের হন, তখন তিনি শুধু একটি সস্তা বা সুবিধাজনক সফর চান না; তিনি চান তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে মিলে যাওয়া একটি অনন্য অভিজ্ঞতা।
সেখানেই মানব ভ্রমণ পরামর্শকের গুরুত্ব টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
প্রযুক্তি হয়তো ভ্রমণের পরিকল্পনাকে দ্রুত, সহজ ও সস্তা করে দেবে। কিন্তু মানুষের পছন্দ বোঝা, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়ানো এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা—এই জায়গাগুলোতে মানবিক দক্ষতার চাহিদা সহজে শেষ হচ্ছে না।
ভবিষ্যতে তাই ভ্রমণশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো অনেক কাজ করবে, কিন্তু মানুষের জায়গা পুরোপুরি দখল করবে না। বিশেষ করে যারা ভ্রমণকে শুধু একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয় হিসেবে দেখেন না, বরং সেটিকে জীবনের বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করতে চান, তাঁদের কাছে একজন দক্ষ মানব ভ্রমণ পরামর্শক আরও দীর্ঘদিন অপরিহার্য হয়ে থাকবেন।
ভ্রমণ পরিকল্পনায় মানুষের ব্যক্তিগত রুচি, অভিজ্ঞতা ও নির্ভরতার মূল্য—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও শেষ হয়ে যায়নি; বরং বিলাসবহুল ভ্রমণে তা নতুন করে আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।
ভ্রমণ এজেন্টের প্রত্যাবর্তন আসলে প্রযুক্তির পরাজয় নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সেবার স্থায়ী শক্তিরই প্রমাণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















