০২:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
রাজনীতির ময়দানে ফের বিতর্ক: বিজয়ের মাকে নিয়ে নাইনর নাগেন্দ্রনের মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা ইন্দোনেশিয়ায় আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৬.৯ মাত্রার কম্পনে কাঁপল উত্তর সুমাত্রা পাকিস্তানের হিন্দুরা ভারত নয়, পাকিস্তানেই থাকতে চান—জারদারির দাবি পাহাড়জয়ী নির্মল পুরজা: অসম্ভবকে সম্ভব করার এক দুরন্ত জীবনের শেষ অধ্যায় তরুণদের হাত ধরে আবারও জমে উঠছে সিনেমা হল শিশুদের কার্টুন ঘিরে কেন এত রাজনীতি? ‘পাপ প্যাট্রোল’ বিতর্কের নেপথ্যে বড় প্রশ্ন সিনেমা হলেই ফিরছে তরুণদের ভিড়, পর্দার জাদুতে নতুন করে মজেছে প্রজন্ম সমুদ্রের তলদেশে তারের জাল: যে অসম্ভব স্বপ্ন বদলে দিয়েছিল তথ্যের পৃথিবী রুয়ান্ডার গণহত্যার ক্ষত ও ক্ষমার কঠিন পথ, ‘জাকারান্ডা’য় গায়েল ফায়ের অনন্য উপন্যাস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও কেন ফিরছে ট্রাভেল এজেন্ট, বিলাসবহুল ভ্রমণে মানুষের বিকল্প নেই

আগুনের আগুনঝড়: দাবানলই যখন তৈরি করছে আরও ভয়ংকর আবহাওয়া

দাবানল শুধু বনভূমি পুড়িয়ে দেয় না, কখনো কখনো সেটিই জন্ম দেয় এমন এক ভয়ংকর ঝড়ের, যা আবার সেই আগুনকেই আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিজ্ঞানীরা এই বিরল আবহাওয়াজনিত ঘটনাকে বলছেন অগ্নিঝড়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও নৌবাহিনীর গবেষণাগারের যৌথ উদ্যোগে এবার এই রহস্যময় ঝড়কে আকাশের ভেতর থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণের বড় ধরনের গবেষণা শুরু হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো থেকে একটি বিশেষ গবেষণাবিমান উড়ে যায়। লক্ষ্য ছিল ওরেগনের একটি দাবানল থেকে তৈরি বিশাল অগ্নিঝড়ের ভেতরে প্রবেশ করে সেখানকার বাতাস, ধোঁয়া, মেঘ ও ঝড়ের গতিবিধি সরাসরি পরিমাপ করা। সাধারণ বিমান যেখানে ভয়ংকর আবহাওয়া এড়িয়ে চলে, সেখানে এই বিমানটির কাজই ছিল সেই বিপজ্জনক ঝড়ের মাঝখানে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করা।

আগুন থেকে কীভাবে তৈরি হয় ভয়ংকর ঝড়

সাধারণ বজ্রঝড় তৈরি হয় যখন উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ওপরে উঠতে উঠতে বাতাস ঠান্ডা হয়, জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। অনুকূল পরিস্থিতিতে সেই মেঘ বিশাল বজ্রমেঘে পরিণত হয়। তখন সৃষ্টি হতে পারে প্রবল বাতাস, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি।

কিন্তু দাবানলের ক্ষেত্রে আগুন নিজেই এই প্রক্রিয়াকে কয়েক গুণ শক্তিশালী করে দেয়। প্রচণ্ড তাপে বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে যায়। আগুনে পুড়তে থাকা গাছপালা থেকে নির্গত জলীয়বাষ্পও সেই ঊর্ধ্বমুখী বায়ুর সঙ্গে ওপরে উঠে যায়। একই সঙ্গে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে মেঘের ভেতরে।

ফলে আগুনের ওপর তৈরি হওয়া মেঘ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধোঁয়া মেঘের ভেতরে বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, আবার বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টি কম হলে মাটিতে পর্যাপ্ত পানি পৌঁছায় না। আগুন তখন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, কোনো দাবানল যখন এমন অগ্নিঝড় তৈরি করে, তখন বোঝা যায় আগুন নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক সীমা অনেকটাই অতিক্রম করেছে।

NASA: Earth almost got hit by a solar storm that could've left millions  without power | Vox

আগুনই আবার আগুন বাড়ায়

অগ্নিঝড়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি শুধু আগুনের ফল নয়—আগুনকে আরও বিধ্বংসী করে তুলতে পারে।

প্রবল ও অনিশ্চিত বাতাস আগুনের গতিপথ দ্রুত বদলে দিতে পারে। বাতাসে জ্বলন্ত অঙ্গার ছড়িয়ে পড়ে নতুন এলাকায় আগুন ধরাতে পারে। বজ্রপাত থেকেও নতুন দাবানলের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে একটি আগুন খুব অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক নতুন আগুনের জন্ম দিতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দমকলকর্মীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আগুন কোন দিকে যাবে, কোথায় নতুন আগুন তৈরি হবে এবং কখন বাতাসের গতি বদলাবে—এসব পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু মাটিতে নয়, প্রভাব পৌঁছে যায় আকাশের অনেক ওপরে

অগ্নিঝড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল উচ্চতা। প্রবল ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ ধোঁয়াকে অনেক ওপরে তুলে দিতে পারে। একপর্যায়ে সেই ধোঁয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরেও পৌঁছে যায়।

সেখানে ধোঁয়ার কণা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করতে পারে এবং অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই কণাগুলো সূর্যের আলো শোষণ করে পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের বায়ুপ্রবাহেও পরিবর্তন আনতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ধোঁয়ার কণার পৃষ্ঠে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দিনের ভয়াবহ দাবানলের সময় একাধিক অগ্নিঝড় প্রায় ১০ লাখ টন ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে তুলে দিয়েছিল। পরিমাণের দিক থেকে এটি মাঝারি মাত্রার একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে তুলনীয়।

বিজ্ঞানীদের সামনে তিন বড় প্রশ্ন

অগ্নিঝড় নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও অনেক কিছু জানেন না। নতুন গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো এই অজানা বিষয়গুলোকে পরিষ্কার করা।

Solar Storms and Flares - NASA Science

প্রথম প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের দাবানল অগ্নিঝড় তৈরি করে এবং কেন কিছু আগুনে এই ঘটনা ঘটে, অথচ অন্য আগুনে ঘটে না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, কোন পরিস্থিতিতে অগ্নিঝড় ধোঁয়াকে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে পৌঁছে দেয় এবং সেখানে কত পরিমাণ ধোঁয়া জমা হয়।

তৃতীয় প্রশ্ন হলো, সেই ধোঁয়া উচ্চ বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন ও পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে ভবিষ্যতের দাবানল ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভুল ধারণা পেতে পারেন।

আকাশ থেকে আগুনের ভেতরে গবেষণা

এই গবেষণায় প্রায় দেড় শতাধিক গবেষক কাজ করছেন। মাটিতে থাকা বিশেষ যানবাহনে বসানো আলোক-অনুসন্ধান ব্যবস্থা, রাডার ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ঝড়ের নিচের অংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আকাশে একটি বিশেষ গবেষণাবিমান সরাসরি অগ্নিঝড়ের মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে নমুনা সংগ্রহ করছে। আরেকটি বিশেষভাবে তৈরি বিমান ঝড়ের মেঘের ওপর দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়ে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে।

২৯ জুলাইয়ের প্রথম বড় অভিযান সফলভাবে এসব পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া বিজ্ঞানী নিজেও সেই বিমানে ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানটি মেঘের ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়।

এরপর ৩ আগস্ট উটাহ অঙ্গরাজ্যে তৈরি হওয়া আরেকটি অগ্নিঝড় থেকে উচ্চ বায়ুমণ্ডলে উঠে যাওয়া ধোঁয়ার প্রথম নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহে প্রায় তিনবার করে এই ধরনের উড্ডয়ন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর

দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে। একই সঙ্গে অগ্নিঝড়ও বিজ্ঞানীদের কাছে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো, উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর সম্পর্ক কতটা গভীর।

আগুনের তীব্রতা বাড়লে অগ্নিঝড়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। আবার অগ্নিঝড় বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কণা ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ এখানে একটি জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে—উষ্ণতা দাবানলকে বাড়ায়, দাবানল অগ্নিঝড় তৈরি করে, আর সেই অগ্নিঝড় আবার বায়ুমণ্ডলে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে যার প্রভাব আরও বিস্তৃত।

NASA is flying planes into wildfires. Here's why | The Independent

তবে এই সম্পর্কের প্রকৃত মাত্রা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তাই নতুন গবেষণার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগুনের মধ্যেই ভবিষ্যৎ সতর্কতার পথ

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভয়াবহ দাবানল দেখা গেছে। জুলাইয়ে ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো অগ্নিঝড় শনাক্ত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে ঘটনাটি কোনো একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণার পাশাপাশি ইউরোপেও বড় পরিসরে দাবানল ও অগ্নিঝড় নিয়ে গবেষণা চলছে। লক্ষ্য একটাই—আগুনের সঙ্গে তৈরি হওয়া চরম আবহাওয়া সম্পর্কে আগে থেকে ভালোভাবে জানা।

কারণ অগ্নিঝড়কে যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, তত দ্রুত বিপজ্জনক আগুনের পরিবর্তিত আচরণ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে দমকলকর্মীদের নিরাপত্তা বাড়তে পারে, আগুন নিয়ন্ত্রণের কৌশল উন্নত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আগুন থেকে জন্ম নেওয়া ঝড় তাই শুধু একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু, বায়ুমণ্ডল ও দাবানলের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা। বিজ্ঞানীরা এখন সেই জানালার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন—আগুন যখন নিজেই আবহাওয়া তৈরি করে, তখন পৃথিবীর জন্য তার পরিণতি কতটা বড় হতে পারে।

আগুনের ধোঁয়ার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দাবানল মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনীতির ময়দানে ফের বিতর্ক: বিজয়ের মাকে নিয়ে নাইনর নাগেন্দ্রনের মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা

আগুনের আগুনঝড়: দাবানলই যখন তৈরি করছে আরও ভয়ংকর আবহাওয়া

০১:২৩:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

দাবানল শুধু বনভূমি পুড়িয়ে দেয় না, কখনো কখনো সেটিই জন্ম দেয় এমন এক ভয়ংকর ঝড়ের, যা আবার সেই আগুনকেই আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিজ্ঞানীরা এই বিরল আবহাওয়াজনিত ঘটনাকে বলছেন অগ্নিঝড়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও নৌবাহিনীর গবেষণাগারের যৌথ উদ্যোগে এবার এই রহস্যময় ঝড়কে আকাশের ভেতর থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণের বড় ধরনের গবেষণা শুরু হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো থেকে একটি বিশেষ গবেষণাবিমান উড়ে যায়। লক্ষ্য ছিল ওরেগনের একটি দাবানল থেকে তৈরি বিশাল অগ্নিঝড়ের ভেতরে প্রবেশ করে সেখানকার বাতাস, ধোঁয়া, মেঘ ও ঝড়ের গতিবিধি সরাসরি পরিমাপ করা। সাধারণ বিমান যেখানে ভয়ংকর আবহাওয়া এড়িয়ে চলে, সেখানে এই বিমানটির কাজই ছিল সেই বিপজ্জনক ঝড়ের মাঝখানে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করা।

আগুন থেকে কীভাবে তৈরি হয় ভয়ংকর ঝড়

সাধারণ বজ্রঝড় তৈরি হয় যখন উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ওপরে উঠতে উঠতে বাতাস ঠান্ডা হয়, জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। অনুকূল পরিস্থিতিতে সেই মেঘ বিশাল বজ্রমেঘে পরিণত হয়। তখন সৃষ্টি হতে পারে প্রবল বাতাস, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি।

কিন্তু দাবানলের ক্ষেত্রে আগুন নিজেই এই প্রক্রিয়াকে কয়েক গুণ শক্তিশালী করে দেয়। প্রচণ্ড তাপে বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে যায়। আগুনে পুড়তে থাকা গাছপালা থেকে নির্গত জলীয়বাষ্পও সেই ঊর্ধ্বমুখী বায়ুর সঙ্গে ওপরে উঠে যায়। একই সঙ্গে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে মেঘের ভেতরে।

ফলে আগুনের ওপর তৈরি হওয়া মেঘ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধোঁয়া মেঘের ভেতরে বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, আবার বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টি কম হলে মাটিতে পর্যাপ্ত পানি পৌঁছায় না। আগুন তখন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, কোনো দাবানল যখন এমন অগ্নিঝড় তৈরি করে, তখন বোঝা যায় আগুন নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক সীমা অনেকটাই অতিক্রম করেছে।

NASA: Earth almost got hit by a solar storm that could've left millions  without power | Vox

আগুনই আবার আগুন বাড়ায়

অগ্নিঝড়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি শুধু আগুনের ফল নয়—আগুনকে আরও বিধ্বংসী করে তুলতে পারে।

প্রবল ও অনিশ্চিত বাতাস আগুনের গতিপথ দ্রুত বদলে দিতে পারে। বাতাসে জ্বলন্ত অঙ্গার ছড়িয়ে পড়ে নতুন এলাকায় আগুন ধরাতে পারে। বজ্রপাত থেকেও নতুন দাবানলের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে একটি আগুন খুব অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক নতুন আগুনের জন্ম দিতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দমকলকর্মীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আগুন কোন দিকে যাবে, কোথায় নতুন আগুন তৈরি হবে এবং কখন বাতাসের গতি বদলাবে—এসব পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু মাটিতে নয়, প্রভাব পৌঁছে যায় আকাশের অনেক ওপরে

অগ্নিঝড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল উচ্চতা। প্রবল ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ ধোঁয়াকে অনেক ওপরে তুলে দিতে পারে। একপর্যায়ে সেই ধোঁয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরেও পৌঁছে যায়।

সেখানে ধোঁয়ার কণা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করতে পারে এবং অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই কণাগুলো সূর্যের আলো শোষণ করে পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের বায়ুপ্রবাহেও পরিবর্তন আনতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ধোঁয়ার কণার পৃষ্ঠে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দিনের ভয়াবহ দাবানলের সময় একাধিক অগ্নিঝড় প্রায় ১০ লাখ টন ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে তুলে দিয়েছিল। পরিমাণের দিক থেকে এটি মাঝারি মাত্রার একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে তুলনীয়।

বিজ্ঞানীদের সামনে তিন বড় প্রশ্ন

অগ্নিঝড় নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও অনেক কিছু জানেন না। নতুন গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো এই অজানা বিষয়গুলোকে পরিষ্কার করা।

Solar Storms and Flares - NASA Science

প্রথম প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের দাবানল অগ্নিঝড় তৈরি করে এবং কেন কিছু আগুনে এই ঘটনা ঘটে, অথচ অন্য আগুনে ঘটে না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, কোন পরিস্থিতিতে অগ্নিঝড় ধোঁয়াকে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে পৌঁছে দেয় এবং সেখানে কত পরিমাণ ধোঁয়া জমা হয়।

তৃতীয় প্রশ্ন হলো, সেই ধোঁয়া উচ্চ বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন ও পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে ভবিষ্যতের দাবানল ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভুল ধারণা পেতে পারেন।

আকাশ থেকে আগুনের ভেতরে গবেষণা

এই গবেষণায় প্রায় দেড় শতাধিক গবেষক কাজ করছেন। মাটিতে থাকা বিশেষ যানবাহনে বসানো আলোক-অনুসন্ধান ব্যবস্থা, রাডার ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ঝড়ের নিচের অংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আকাশে একটি বিশেষ গবেষণাবিমান সরাসরি অগ্নিঝড়ের মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে নমুনা সংগ্রহ করছে। আরেকটি বিশেষভাবে তৈরি বিমান ঝড়ের মেঘের ওপর দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়ে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে।

২৯ জুলাইয়ের প্রথম বড় অভিযান সফলভাবে এসব পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া বিজ্ঞানী নিজেও সেই বিমানে ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানটি মেঘের ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়।

এরপর ৩ আগস্ট উটাহ অঙ্গরাজ্যে তৈরি হওয়া আরেকটি অগ্নিঝড় থেকে উচ্চ বায়ুমণ্ডলে উঠে যাওয়া ধোঁয়ার প্রথম নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহে প্রায় তিনবার করে এই ধরনের উড্ডয়ন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর

দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে। একই সঙ্গে অগ্নিঝড়ও বিজ্ঞানীদের কাছে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো, উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর সম্পর্ক কতটা গভীর।

আগুনের তীব্রতা বাড়লে অগ্নিঝড়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। আবার অগ্নিঝড় বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কণা ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ এখানে একটি জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে—উষ্ণতা দাবানলকে বাড়ায়, দাবানল অগ্নিঝড় তৈরি করে, আর সেই অগ্নিঝড় আবার বায়ুমণ্ডলে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে যার প্রভাব আরও বিস্তৃত।

NASA is flying planes into wildfires. Here's why | The Independent

তবে এই সম্পর্কের প্রকৃত মাত্রা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তাই নতুন গবেষণার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগুনের মধ্যেই ভবিষ্যৎ সতর্কতার পথ

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভয়াবহ দাবানল দেখা গেছে। জুলাইয়ে ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো অগ্নিঝড় শনাক্ত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে ঘটনাটি কোনো একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণার পাশাপাশি ইউরোপেও বড় পরিসরে দাবানল ও অগ্নিঝড় নিয়ে গবেষণা চলছে। লক্ষ্য একটাই—আগুনের সঙ্গে তৈরি হওয়া চরম আবহাওয়া সম্পর্কে আগে থেকে ভালোভাবে জানা।

কারণ অগ্নিঝড়কে যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, তত দ্রুত বিপজ্জনক আগুনের পরিবর্তিত আচরণ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে দমকলকর্মীদের নিরাপত্তা বাড়তে পারে, আগুন নিয়ন্ত্রণের কৌশল উন্নত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আগুন থেকে জন্ম নেওয়া ঝড় তাই শুধু একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু, বায়ুমণ্ডল ও দাবানলের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা। বিজ্ঞানীরা এখন সেই জানালার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন—আগুন যখন নিজেই আবহাওয়া তৈরি করে, তখন পৃথিবীর জন্য তার পরিণতি কতটা বড় হতে পারে।

আগুনের ধোঁয়ার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দাবানল মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।