ভ্রমণের পরিকল্পনা করার ধরন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। একসময় বিদেশ ভ্রমণে কোথায় যাবেন, কোথায় খাবেন কিংবা কোন পথে ঘুরবেন—এসব জানতে মানুষ ভরসা করতেন ভ্রমণ নির্দেশিকা, অভিজ্ঞ পর্যটক, ট্রাভেল এজেন্ট কিংবা পরিচিতজনের ওপর। পরে সেই জায়গা দখল করে নেয় অনলাইন পর্যালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ছবি-ভিডিওভিত্তিক প্রচারণা। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত কথোপকথন ব্যবস্থা। আর এর প্রভাব শুধু ভ্রমণ পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পর্যটনের ভৌগোলিক মানচিত্রও বদলে দিতে পারে এই প্রযুক্তি।
রোমে দুপুরের তীব্র রোদে ঘুরতে ঘুরতে একজন পর্যটক যখন পিৎজা খেতে চান, তখন প্রশ্ন ওঠে—কোথায় গেলে সবচেয়ে ভালো হবে? প্রচলিত ভ্রমণ নির্দেশিকা হয়তো একটি বিখ্যাত খাবারের দোকানের নাম বলবে। অনলাইন পর্যালোচনা ব্যবস্থা অন্য একটি জনপ্রিয় দোকানকে সবার ওপরে রাখবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার এমন কোনো দোকানের ছবি ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে তরুণ পর্যটকদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
এই তিন ধরনের পরামর্শের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—জনপ্রিয় জায়গাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
ভ্রমণ পরামর্শের ইতিহাসে এটি বড় পরিবর্তন
বিদেশ ভ্রমণের শুরুর যুগে পর্যটকদের অনেকটাই নির্ভর করতে হতো ভ্রমণ সংস্থা ও সংগঠিত ভ্রমণ ব্যবস্থার ওপর। উনিশ শতকে টমাস কুকের মতো ভ্রমণ উদ্যোক্তারা পর্যটকদের বিদেশে ঘোরার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করে দিতেন। পরে মানুষ ক্রমশ নিজেরাই ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ নির্দেশিকা তাদের কোথায় যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে এবং কোথায় খেতে হবে—তার ধারণা দিতে থাকে।

একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ নির্দেশিকায় কোনো শহরের নির্দিষ্ট খাবারের দোকান বা আবাসনের প্রশংসা প্রকাশিত হলেই সেখানে পর্যটকের ঢল নামত। ব্যাংককের কোনো আবাসন কিংবা কাঠমান্ডুর কোনো খাবারের দোকান একটি জনপ্রিয় নির্দেশিকায় জায়গা পাওয়ার পর রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠার ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না।
এরপর আসে ইন্টারনেট। পর্যটকের অভিজ্ঞতা আর কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকল না। মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে শুরু করলেন, ছবি দিলেন, নম্বর দিলেন এবং অন্যদের জানালেন কোন জায়গা ভালো আর কোনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
অনলাইন পর্যালোচনার শক্তি কতটা
অনলাইন পর্যালোচনা ব্যবস্থা পর্যটনের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছে। কোনো রেস্তোরাঁর হাজার হাজার ভালো পর্যালোচনা থাকলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই নতুন পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আবার কম নম্বর পাওয়া কোনো জায়গা পর্যটকের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।
ইউরোপে মোবাইল রোমিংয়ের অতিরিক্ত খরচ কমে যাওয়ার পর পর্যটকেরা চলতি অবস্থাতেই অনলাইন পর্যালোচনা দেখতে আরও বেশি আগ্রহী হন। এর ফলে পর্যটননির্ভর রেস্তোরাঁগুলোর আয়ও বেড়েছিল, বিশেষ করে যেসব রেস্তোরাঁ অনলাইন পর্যালোচনায় বেশি নম্বর পেয়েছিল।
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি অনলাইনে পরামর্শ নিতে শুরু করেছে, জনপ্রিয়তার ওপর পর্যটনের নির্ভরতা তত বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও বড় পরিবর্তন এনেছে
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভ্রমণপ্রবণতাকে আরও অপ্রত্যাশিত করে তোলে। কোনো সুন্দর হ্রদ, পাহাড়ি গ্রাম, রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান কিংবা অচেনা কোনো স্থানের ছবি হঠাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
অস্ট্রিয়ার হালস্টাটের মতো ছবির মতো সুন্দর ছোট শহর পর্যটকের অতিরিক্ত চাপে বিপাকে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খাবারের দোকান জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারি দেখা গেছে। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল মানুষকে ভ্রমণে উৎসাহিত করেনি; একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে পর্যটকের ভিড়ও বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়েছে।
এখন সেই জায়গায় প্রবেশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সবাইকে একই জায়গায় পাঠাবে?
অনেকের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলো যেহেতু সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি, তাই ভ্রমণ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তারাও পরিচিত ও জনপ্রিয় জায়গাগুলোর নামই বেশি বলবে।

এই আশঙ্কার যথেষ্ট ভিত্তিও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রতি বেশি ঝোঁক দেখায়। কেউ যদি ‘বার্সেলোনায় কোথায় যাব’—এমন সাধারণ প্রশ্ন করেন, তাহলে সাগরাদা ফামিলিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত স্থান সামনে আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
একটি গবেষণায় বার্সেলোনার প্রায় ১০ হাজার পর্যটন পরামর্শ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায় ২১৫টি স্থানের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। অথচ পর্যটকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি ভিন্ন স্থান থেকে ছবি প্রকাশ করেছিলেন।
অর্থাৎ, বাস্তব পর্যটকের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরামর্শ তুলনামূলকভাবে সংকুচিত ছিল। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এমন আকর্ষণের নামও পাওয়া গেছে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
এতে যদি সবাই একই ধরনের পরামর্শ অনুসরণ করেন, তাহলে পর্যটনকেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি দিক আছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু একটি ‘জনপ্রিয় জায়গার তালিকা তৈরির যন্ত্র’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কারণ একই প্রশ্নের উত্তরও সব সময় এক থাকে না।
বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। কোনোটি অনলাইন ভ্রমণ নির্দেশিকার তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে, কোনোটি মানচিত্রভিত্তিক পর্যালোচনাকে গুরুত্ব দিতে পারে, আবার কোনোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা আলোচনাভিত্তিক ওয়েবসাইটের তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
ফলে রোমে ভালো পিৎজা কোথায় পাওয়া যায়—এই একই প্রশ্নের উত্তর একেকটি ব্যবস্থায় একেক রকম হতে পারে। কেউ ভ্যাটিকানের কাছের একটি জনপ্রিয় দোকানের নাম বলতে পারে, অন্য কেউ প্যানথিয়নের কাছাকাছি তুলনামূলক ছোট কোনো দোকানের কথা বলতে পারে।
এমনকি একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকেও একই প্রশ্ন বারবার করলে ভিন্ন উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এগুলো নির্দিষ্ট একটি স্থির তালিকা থেকে উত্তর দেয় না; সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে উত্তর তৈরি করে।
ফলে কোনো একটি দোকান সবচেয়ে বেশি সুপারিশ পেলেও সেটি প্রতিটি ব্যবহারকারীর কাছে উঠে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এই বৈশিষ্ট্য পর্যটনকে বরং ছড়িয়ে দিতে পারে।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে ব্যক্তিগত পরামর্শ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত শক্তি সম্ভবত জনপ্রিয় জায়গার তালিকা তৈরিতে নয়, ব্যক্তির জন্য আলাদা ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরিতে।
একজন পর্যটক যদি নিরামিষভোজী হন, তাহলে তাঁর জন্য খাবারের তালিকা আলাদা হবে। কেউ যদি কম খরচে ভ্রমণ করতে চান, তাঁর জন্য অন্য পরিকল্পনা তৈরি হবে। কেউ যদি বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা চান, তাঁর পরামর্শ আবার ভিন্ন হবে। কেউ যদি ভিড় একেবারেই পছন্দ না করেন, তাহলে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি স্থান বেছে দেওয়া সম্ভব।
একজন পর্যটক হয়তো ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে চান, আরেকজন সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত জায়গা খুঁজবেন। কেউ পরিবারের শিশুদের উপযোগী স্থান চাইবেন, কেউ আবার রাতের শহর, খাবার বা প্রকৃতি নিয়ে আগ্রহী হবেন।
এই ব্যক্তিগত পছন্দগুলো যত বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বুঝতে পারবে, ভ্রমণ পরামর্শও তত বেশি ব্যক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।
এখানেই পুরোনো ভ্রমণ নির্দেশিকার সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। একটি বই হাজার হাজার পাঠককে প্রায় একই ধরনের পরামর্শ দেয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একজন মানুষের প্রশ্ন, আগের কথোপকথন এবং পছন্দের ভিত্তিতে আলাদা উত্তর তৈরি করতে পারে।
ভ্রমণও কি ব্যক্তিগতকৃত হয়ে যাবে?
সঙ্গীত শোনার ক্ষেত্রে মানুষ এখন আর সবাই একই তালিকা পান না। একজনের পছন্দ অনুযায়ী যে গান সামনে আসে, অন্য ব্যক্তির পর্দায় তা নাও আসতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভ্রমণ পরামর্শও ধীরে ধীরে একই ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
এর ফলে পর্যটন জনপ্রিয়তার গণতন্ত্র থেকে ব্যক্তিগত পছন্দের অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে।
আজ কোনো জায়গা জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ হতে পারে হাজার হাজার মানুষের ভালো পর্যালোচনা। ভবিষ্যতে কোনো জায়গা হয়তো জনপ্রিয় না হয়েও একজন নির্দিষ্ট পর্যটকের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে।
এতে পর্যটনের ওপর চাপও কিছুটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই শহরের কয়েকটি বিখ্যাত স্থানের ওপর সব পর্যটকের নির্ভরতা কমে গিয়ে ছোট জাদুঘর, স্থানীয় খাবারের দোকান, অখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান কিংবা শহরের প্রান্তের আকর্ষণগুলোও পর্যটকের নজরে আসতে পারে।
তবে ঝুঁকিও থেকেই যাচ্ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব সময় সঠিক তথ্য দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল তথ্য, পুরোনো তথ্য কিংবা বাস্তবে অস্তিত্বহীন কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠানের নামও সামনে আসতে পারে। তাই ভ্রমণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরামর্শকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
তবু বড় ছবিতে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণ নির্দেশিকা যেখানে সাধারণ পর্যটককে একই ধরনের গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেখানে হঠাৎ কোনো একটি জায়গাকে কোটি মানুষের সামনে তুলে ধরে, সেখানে ব্যক্তিগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী একজন পর্যটকের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা পথ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের পর্যটন তাই হয়তো এমন হবে না যে সবাই একই জায়গায় যাবে। বরং একই শহরে গিয়ে প্রত্যেক মানুষ আলাদা শহর আবিষ্কার করবেন—নিজের পছন্দ, সামর্থ্য ও কৌতূহল অনুযায়ী।
রোমের সেরা পিৎজা কোনটি—এই প্রশ্নের আর একটি মাত্র উত্তর থাকবে না। উত্তরটি নির্ভর করবে আপনি কে, কী খেতে চান, কত খরচ করতে চান এবং কী ধরনের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন তার ওপর। আর এই ব্যক্তিগত পার্থক্যই হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় উপহার—পর্যটকের ভিড়কে এক জায়গায় জমা না করে তাকে ছড়িয়ে দেওয়া।
ভ্রমণকে সবার জন্য একই করে তোলার বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো শেষ পর্যন্ত ভ্রমণকে করে তুলবে প্রত্যেকের জন্য আলাদা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















